খেলাধুলো

হকির মাঠে শতবর্ষের সেতুবন্ধন: ধ্যানচাঁদের জাদু থেকে প্রিয়া ভিখা – ভারত ও নিউজিল্যান্ডের ক্রীড়াসম্পর্কের এক অনন্য ইতিহাস



শুভ্রাংশু রায়


১৯২৬ সালের জুন মাস। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে ল্যাঙ্কাস্টার পার্কের মাঠে মুখোমুখি ভারতীয় সেনাবাহিনীর হকি দল ও নিউজিল্যান্ড। গ্যালারিতে উপচে পড়া দর্শক। লাল জার্সি পরা ভারতীয় খেলোয়াড়দের স্টিকে বলের অবিশ্বাস্য নিয়ন্ত্রণ, ছোট ছোট পাসে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়ার দক্ষতা এবং আক্রমণের নিখুঁত ছন্দ দর্শকদের মুগ্ধ করছে। সেই দলেরই এক তরুণ খেলোয়াড় ধ্যানচাঁদ – যিনি পরবর্তীকালে বিশ্ব হকির ইতিহাসে কিংবদন্তিতে পরিণত হবেন।

ভারত ৫-২ গোলে জিতেছিল সেই ম্যাচ। কিন্তু এই জয় শুধু একটি আন্তর্জাতিক হকি ম্যাচের ফলাফল ছিল না। এর মধ্য দিয়ে সূচিত হয়েছিল ভারত ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে ক্রীড়াক্ষেত্রে এক দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের, যা ২০২৬ সালে শতবর্ষে পৌঁছেছে।

এক শতাব্দী আগে শুরু হওয়া সেই সম্পর্ক আজ আর শুধু হকির মাঠে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারতীয় অভিবাসী সমাজের ইতিহাস, সাংস্কৃতিক পরিচয়, জাতিগত আত্মমর্যাদা, নারী-পুরুষের সমানাধিকারের প্রশ্ন এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া-সহযোগিতার বিবর্তন। ধ্যানচাঁদের স্টিকের জাদু থেকে নিউজিল্যান্ডের অলিম্পিক স্বর্ণপদক, রমেশ প্যাটেলের সাফল্য থেকে প্রিয়া ভিখার পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠা – এই ইতিহাস আসলে দুই দেশের মানুষের পারস্পরিক পরিচিতি ও বন্ধুত্বের ইতিহাস।

১৯২৬: এক ঐতিহাসিক সফরের সূচনা

১৯২৬ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হকি দলের নিউজিল্যান্ড সফর ছিল ভারতীয় খেলাধুলার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এটিই ছিল প্রথম ভারতীয় ক্রীড়াদলের নিউজিল্যান্ড সফর এবং প্রথম ভারতীয় হকি দলের বিদেশ সফর। নিউজিল্যান্ড হকি অ্যাসোসিয়েশন এই সফরের জন্য ৫০০ পাউন্ড অর্থব্যয় করে যে আর্থিক ঝুঁকি নিয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত অভাবনীয় সাফল্যে পরিণত হয়।

ভারতীয় দলটির নেতৃত্বে ছিলেন ডেভিড টেন্যান্ট কাউয়ান। ১৭ সদস্যের এই দলে ছিলেন চারজন ব্রিটিশ অফিসার, একজন শিখ অফিসার এবং ১২ জন ভারতীয় সেনাসদস্য। কলকাতা থেকে ১৯২৬ সালের ১১ এপ্রিল সমুদ্রযাত্রা শুরু করে দলটি শ্রীলঙ্কা ও অস্ট্রেলিয়া হয়ে নিউজিল্যান্ডে পৌঁছয়। ২৬ জুন ক্রাইস্টচার্চে অনুষ্ঠিত প্রথম সরকারি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ভারত নিউজিল্যান্ডকে ৫-২ গোলে পরাজিত করে। ধ্যানচাঁদ করেন হ্যাটট্রিক।

পরবর্তী ম্যাচে অকল্যান্ডে নিউজিল্যান্ড ৪-৩ গোলে জয়ী হয়। তৃতীয় ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হয়। ফলে তিন টেস্টের সিরিজ শেষ হয় ১-১ ব্যবধানে। শেষ ম্যাচে ২৫ হাজারেরও বেশি দর্শকের উপস্থিতির কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে। সংখ্যাটি সত্যিই সেই সময়ের জনসমাগমের প্রতিফলন হলে, তা নিউজিল্যান্ডে হকির জনপ্রিয়তার এক অসাধারণ নিদর্শন।

সফরটির সাফল্য শুধু মাঠের ফলাফলে সীমাবদ্ধ ছিল না। নিউজিল্যান্ডের মানুষ প্রথমবার এত নিবিড়ভাবে ভারতীয় হকির এক স্বতন্ত্র শৈলীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান। সেই পরিচয় পরবর্তী কয়েক দশকে নিউজিল্যান্ডের হকির বিকাশেও প্রভাব ফেলেছিল।

ধ্যানচাঁদ: একটি স্টিক, অসংখ্য বিস্ময়

ভারতীয় হকির ইতিহাসে ধ্যানচাঁদ এমন এক নাম, যাঁর প্রতিভা দেশ-কাল-ভাষার সীমা অতিক্রম করেছে। বলের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ, প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার কৌশল এবং কখন ব্যক্তিগত দক্ষতার বদলে সতীর্থকে পাস দিতে হবে, সেই সহজাত বোধ তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছিল।

নিউজিল্যান্ডের হকি ছিল তুলনামূলকভাবে শারীরিক শক্তি ও সরাসরি আক্রমণনির্ভর। ভারতীয় দল দেখিয়েছিল অন্য এক পথ – দ্রুত পাস, বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ, দলগত সমন্বয় এবং সৃজনশীল আক্রমণ। এই পার্থক্যই দর্শকদের কাছে ভারতীয় হকিকে আকর্ষণীয় করে তোলে।

১৯২৮ সালের আমস্টারডাম অলিম্পিকে ভারত প্রথমবার হকিতে স্বর্ণপদক জয় করে। এরপর ১৯৩২ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস এবং ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকেও ভারত স্বর্ণপদক অর্জন করে। পরবর্তী সময়ে ভারতীয় পুরুষ হকি দল অলিম্পিকে টানা ছয়বার স্বর্ণপদক জয়ের ঐতিহাসিক কৃতিত্ব অর্জন করে – ১৯২৮ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত।

তবে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ভারতীয় হকির সম্পর্কের গুরুত্ব শুধু ভারতের সাফল্যের ইতিহাসে নয়। এই যোগাযোগ নিউজিল্যান্ডের খেলোয়াড়দেরও নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছিল – কীভাবে বলের দখল বজায় রেখে দলগতভাবে আক্রমণ গড়ে তোলা যায়, কীভাবে পাসের নির্ভুলতা দিয়ে শারীরিক শক্তির ঘাটতি পূরণ করা যায়।

১৯৩৫ ও ১৯৩৮: মাঠের বাইরে সম্পর্কের বিস্তার

১৯৩৫ সালে ভারতীয় জাতীয় হকি দল আবার নিউজিল্যান্ড সফর করে। সফরে ভারত ২৮টি ম্যাচ খেলে এবং সবকটিতেই জয়ী হয়। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজেও ভারত ৩-০ ব্যবধানে জয়লাভ করে। ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকে জার্মানিকে ফাইনালে ৮-১ গোলে হারিয়ে ভারত আবার স্বর্ণপদক জেতে।

ভারতীয় দলের খেলার ধরন নিউজিল্যান্ডের হকিতে কীভাবে প্রভাব ফেলেছিল, সে সম্পর্কে নিউজিল্যান্ডের ক্রীড়া-ইতিহাসবিদ জিওফ ওয়াটসন গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাঁর মতে, ভারতীয় খেলোয়াড়দের নির্ভুল পাস, ব্যাক পাসের ব্যবহার এবং দলগত সমন্বয় নিউজিল্যান্ডের বহু খেলোয়াড় ও কোচের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন এনেছিল। পরবর্তীকালে কোচ সিরিল ওয়াল্টারের মতো ব্যক্তিত্ব ভারতীয় শৈলীর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য গ্রহণ করেন। তাঁর প্রশিক্ষণে গড়ে ওঠা খেলোয়াড়েরা ১৯৭৬ সালের অলিম্পিকে নিউজিল্যান্ডের ঐতিহাসিক সাফল্যের সঙ্গে যুক্ত হন।

১৯৩৮ সালে মানাভাদারের যুবরাজের দল নিউজিল্যান্ড সফরে আসে। আড়াই মাসে তারা ৩১টি হকি ম্যাচ খেলে। পাশাপাশি দুটি ক্রিকেট ম্যাচেও অংশ নেয়। অর্থাৎ, হকিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া যোগাযোগ ক্রমশ অন্যান্য খেলাতেও বিস্তৃত হচ্ছিল।

কিন্তু এই সফরগুলির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল নিউজিল্যান্ডে ভারতীয় ক্রীড়া ক্লাবের বিকাশ। ১৯৩৫ সালে ওয়েলিংটনে ভারতীয় ক্রীড়া ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৩৬ সালে অকল্যান্ড ও ক্রাইস্টচার্চেও অনুরূপ সংগঠন গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে এই ধারার সম্প্রসারণ ঘটে এবং ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় নিউজিল্যান্ড ইন্ডিয়ান স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশন।

একটি খেলা কীভাবে অভিবাসী সমাজের সংহতির মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এই ইতিহাস। নতুন দেশে বসবাস করতে এসে ভারতীয় অভিবাসীদের সামনে ছিল কাজের অনিশ্চয়তা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন এবং নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয় বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ। ক্রীড়া ক্লাব তাঁদের পারস্পরিক যোগাযোগ, বন্ধুত্ব ও সম্মিলিত পরিচয় গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র তৈরি করেছিল।

১৯৭৬: নিউজিল্যান্ডের স্বর্ণজয় ও ভারতীয় হকির প্রভাব

১৯৭৬ সালের মন্ট্রিয়ল অলিম্পিক নিউজিল্যান্ডের হকি-ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায়। ফাইনালে অস্ট্রেলিয়াকে ১-০ গোলে পরাজিত করে নিউজিল্যান্ড পুরুষ হকিতে অলিম্পিক স্বর্ণপদক জয় করে।

এই সাফল্যের পেছনে প্রশিক্ষণ, খেলোয়াড়দের প্রস্তুতি, কোচিং এবং দলগত সমন্বয়ের মতো বহু কারণ ছিল। তবে নিউজিল্যান্ডের হকির বিকাশে ভারতীয় খেলার শৈলীর প্রভাবও বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।

১৯৭৬ সালের অলিম্পিকের আগে নিউজিল্যান্ডের দল ভারতীয় দলের বিরুদ্ধে দুটি ম্যাচ খেলেছিল এবং দুটিতেই পরাজিত হয়েছিল। কিন্তু প্রতিপক্ষের খেলার ধরন পর্যবেক্ষণ করে শেখার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। ভারতীয় হকির পাসনির্ভর কৌশল এবং বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিউজিল্যান্ডের কোচ ও খেলোয়াড়দের কাছে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার বিষয় হয়ে ওঠে।

এই ইতিহাসের তাৎপর্য এখানেই যে, আন্তর্জাতিক খেলায় প্রতিপক্ষের কাছে পরাজয়ও ভবিষ্যৎ সাফল্যের প্রস্তুতি হয়ে উঠতে পারে। খেলাধুলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়; এটি কৌশল শেখা, নিজেদের দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং খেলার ধরন উন্নত করারও সুযোগ।

রমেশ প্যাটেল: অভিবাসী থেকে অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন

নিউজিল্যান্ডের জাতীয় হকি দলে ভারতীয় বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের ইতিহাসে রমেশ প্যাটেলের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক অভিষেকের পর তিনি ব্ল্যাক স্টিকসের হয়ে ১২৬টি ম্যাচ খেলেন। ১৯৭৬ সালের অলিম্পিক স্বর্ণপদকজয়ী দলের সদস্য হওয়ার পাশাপাশি পরবর্তীকালে হকি নিউজিল্যান্ডের প্রধান নির্বাহী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

গুজরাট থেকে নিউজিল্যান্ডে আসা তাঁর বাবা-মা ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকের ভারতীয় হকি সফর সম্পর্কে আলোচনা করতেন। রমেশের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে, প্রথম দিকের ভারতীয় অভিবাসীদের কাছে নিউজিল্যান্ড সবসময় স্বাগতপূর্ণ পরিবেশ ছিল না। ভারতীয় হকি দলের সাফল্য সেই দূরত্ব কিছুটা কমাতে সাহায্য করেছিল।

ভারতীয় খেলোয়াড়দের দক্ষতা ও আচরণ নিউজিল্যান্ডের দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। রমেশের মতে, এই সফরগুলি নিউজিল্যান্ডে বসবাসকারী ভারতীয়দের আত্মমর্যাদাবোধ বাড়াতে এবং তাঁদের হকির প্রতি আরও উৎসাহিত করতে ভূমিকা পালন করে।

এই অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ক্রীড়াক্ষেত্রে সাফল্য অনেক সময় একটি অভিবাসী সম্প্রদায়ের সামাজিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে। মাঠে একজন খেলোয়াড়ের দক্ষতা জাতিগত পরিচয়ের প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাতে পারে। তবে খেলাধুলা একা বৈষম্য দূর করতে পারে না; বরং পারস্পরিক পরিচিতি ও সম্মান গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ তৈরি করে।

মহিলা হকির ইতিহাসে প্রিয়া ভিখা

ভারতীয় বংশোদ্ভূত পুরুষ খেলোয়াড়দের নিউজিল্যান্ডের জাতীয় দলে উপস্থিতি দীর্ঘদিনের হলেও, মহিলা দলে সেই প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে অনেক বেশি সময় লেগেছিল। ২০০৩ সালে প্রিয়া ভিখা নিউজিল্যান্ডের মহিলা জাতীয় হকি দল – ব্ল্যাক স্টিকসের হয়ে খেলার সুযোগ পান। তিনি ছিলেন এই দলের প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত মহিলা খেলোয়াড়।

ওয়েলিংটনে জন্ম ও বেড়ে ওঠা প্রিয়ার পারিবারিক শিকড় গুজরাটে। তাঁর কাছে জাতীয় দলের হয়ে খেলা ছিল শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং পরিবার ও বৃহত্তর ভারতীয় সম্প্রদায়ের সম্মিলিত অর্জন।

প্রিয়া জানিয়েছেন, পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, ভারতীয় ক্রীড়া ক্লাব এবং বৃহত্তর ভারতীয় সম্প্রদায়ের মানুষজন তাঁকে প্রশিক্ষণ, যাতায়াত ও উৎসাহের মাধ্যমে সাহায্য করেছিলেন। তাঁর এই অভিজ্ঞতা দেখায়, একজন খেলোয়াড়ের সাফল্যের পেছনে ব্যক্তিগত প্রতিভার পাশাপাশি সামাজিক সহায়তারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে।

কিন্তু পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের জাতীয় দলে প্রবেশে এত দীর্ঘ বিলম্ব কেন?

প্রিয়ার অভিজ্ঞতা এই প্রশ্নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তর দেয়। তাঁর মতে, অনেক ভারতীয় পরিবারে পুরুষদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে সহজ হলেও মহিলাদের ক্ষেত্রে গৃহস্থালির কাজ ও সামাজিক প্রত্যাশা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াত। তাঁর মা রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং অন্যান্য গৃহস্থালির কাজ শেষ না করে খেলতে যেতে পারতেন না। অনেক মহিলাকে কেবল নারী হওয়ার কারণেই খেলাধুলায় অংশ নিতে দেওয়া হত না।

প্রিয়ার বাবা-মা তাঁকে এই ধরনের বাধার মধ্যে আবদ্ধ করেননি। তাঁরা তাঁকে নিজের স্বপ্ন অনুসরণ করতে উৎসাহিত করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে প্রিয়া উপলব্ধি করেন, তাঁর নিজের সাফল্যের পথ তৈরি করতে তাঁর মাকেও হয়তো বাড়িতে অতিরিক্ত দায়িত্ব বহন করতে হয়েছে।

এই উপলব্ধি নারী-ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে। খেলাধুলায় মহিলাদের সাফল্যকে শুধু ব্যক্তিগত প্রতিভা বা অধ্যবসায়ের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে পারিবারিক শ্রমের বণ্টন, সামাজিক রক্ষণশীলতা, প্রশিক্ষণের সুযোগ এবং স্বাধীনভাবে নিজের সময় ব্যবহারের অধিকার।

প্রিয়া ভিখার অভিষেক তাই শুধু একজন খেলোয়াড়ের সাফল্য নয়। এটি পরবর্তী প্রজন্মের ভারতীয় বংশোদ্ভূত মেয়েদের কাছে একটি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়ার ঘটনা।

কমনওয়েলথ গেমস: প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন অধ্যায়

১৯৯৮ সালে কুয়ালালামপুর কমনওয়েলথ গেমসে প্রথমবার হকি অন্তর্ভুক্ত হয়। পুরুষদের ব্রোঞ্জ পদকের ম্যাচে ভারত নিউজিল্যান্ডকে ৩-১ গোলে পরাজিত করে। মহিলাদের বিভাগে নিউজিল্যান্ড ৩-০ গোলে ভারতকে হারিয়ে ব্রোঞ্জপদক অর্জন করে।

২০০২ সালের ম্যানচেস্টার কমনওয়েলথ গেমসে ভারতীয় মহিলা দল সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারায়। ম্যাচে পেনাল্টি স্ট্রোক নিয়ে আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ভারত জয়লাভ করে ফাইনালে পৌঁছয় এবং স্বর্ণপদক অর্জন করে।

২০০৬ সালে মেলবোর্নে ভারত আবার সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে ১-০ গোলে হারায়। ২০১০ সালে দিল্লিতে ভারতীয় পুরুষ দল রৌপ্যপদক এবং নিউজিল্যান্ড ব্রোঞ্জপদক জেতে। ২০১৪ সালে ভারত সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে ৩-২ গোলে পরাজিত করে। ২০১৮ সালে নিউজিল্যান্ড পুরুষদের সেমিফাইনালে ভারতকে ৩-২ গোলে হারিয়ে রৌপ্যপদক জেতে।

২০২২ সালের বার্মিংহাম কমনওয়েলথ গেমসে ভারতীয় পুরুষ দল রৌপ্যপদক অর্জন করে। ভারতীয় মহিলা দল পেনাল্টি শুটআউটে নিউজিল্যান্ডকে পরাজিত করে ব্রোঞ্জপদক জেতে।

এই ফলাফলগুলি দুই দেশের হকি সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে। ভারতীয় হকির ঐতিহাসিক প্রভাব থাকলেও নিউজিল্যান্ডও আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজস্ব শক্তিশালী অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেছে। একসময়ের শিক্ষার্থী ও প্রভাবগ্রহণকারী দল পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সমান গুরুত্ব নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। ফলে এই সম্পর্ককে একমুখী প্রভাবের ইতিহাস না বলে পারস্পরিক শিক্ষা ও প্রতিযোগিতার ইতিহাস বলাই যুক্তিযুক্ত।

শতবর্ষের শিক্ষা: হকি শুধু খেলা নয়

২০২৬ সালে ভারত ও নিউজিল্যান্ডের ক্রীড়াসম্পর্কের শতবর্ষ উদ্‌যাপন আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সত্য তুলে ধরে – খেলাধুলা কখনও কখনও রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের বাইরেও মানুষের মধ্যে স্থায়ী সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে।

১৯২৬ সালের ভারতীয় সেনাবাহিনীর হকি দল নিউজিল্যান্ডে গিয়েছিল একটি ক্রীড়া সফরে। কিন্তু তার প্রভাব বিস্তৃত হয়েছিল মাঠের বাইরে। ভারতীয় হকির শৈলী নিউজিল্যান্ডের খেলাকে প্রভাবিত করেছিল, ভারতীয় ক্রীড়া ক্লাবগুলি অভিবাসী সমাজের সংহতি গড়ে তুলেছিল এবং রমেশ প্যাটেল ও প্রিয়া ভিখার মতো খেলোয়াড়েরা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নতুন সম্ভাবনার দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছিলেন।

এই ইতিহাসে ধ্যানচাঁদের জাদুকরী স্টিকওয়ার্ক যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে নিউজিল্যান্ডের অলিম্পিক সাফল্য। রয়েছে অভিবাসী পরিবারের স্মৃতি, সামাজিক স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা এবং খেলাধুলায় নারী-পুরুষের সমানাধিকারের সংগ্রাম।

একশো বছর আগে যে সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল, তা আজ আরও বিস্তৃত ক্রীড়া-সহযোগিতার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের শতবর্ষ উদ্‌যাপন সেই ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের স্মারক।

হকির মাঠে ভারত ও নিউজিল্যান্ডের গল্প তাই শুধু গোল, পেনাল্টি, পদক কিংবা পরাজয়ের গল্প নয়। এটি মানুষের গল্প – যেখানে একটি খেলা দুই দেশের মানুষকে পরস্পরের কাছে নিয়ে এসেছে, সাংস্কৃতিক দূরত্ব কমিয়েছে এবং নতুন প্রজন্মকে শিখিয়েছে যে প্রতিযোগিতার মধ্যেও বন্ধুত্বের জায়গা থাকে।

১৯২৬ সালে শুরু হওয়া সেই যাত্রার একশো বছর পরেও হকির মাঠে দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এই সত্যটিই – খেলার ভাষা আলাদা হতে পারে, কিন্তু সম্মান, দক্ষতা ও বন্ধুত্বের ভাষা সর্বজনীন।

পরিচিতি: অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক। কলকাতা।