মনোজগত এক আশ্চর্য মায়াজগৎ! তার কোথায় শুরু, কোথায় শেষ, সেই হদিস করতে করতেই কেটে যায় জীবন! তবু কি মেলে তার কিনারা? সে জগতে কতটুকু ঠিক আর কতটা বেঠিক তার হিসেব মেলানোও কি সহজ? মন খারাপ করা, খুব খুশি হওয়া, ভুলে যাওয়া, কখনো সখনো একটু আধটু খ্যাপামি এতো নিরন্তর ঘটে চলেছে আমাদের প্রত্যেকের জীবনে। এই রঙের মিশেল না থাকলে তো জীবনটা বড়ই বর্ণহীন, একঘেয়ে হয়ে যেত। আবার এগুলোই কখনো হয়ে ওঠে মনোরোগের লক্ষণ।
তাহলে কোথায় আমরা স্বাভাবিকতার সীমা টানব? যখন তা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনকে বিপর্যস্ত করবে, ছাপ ফেলবে সাংসারিক, ব্যবহারিক জীবনে, কর্মক্ষেত্রে, তখন তাকে আমরা অস্বাভাবিকতা বলে গণ্য করতে পারি। তখন দরকার মনোবিদ বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের হস্তক্ষেপ।
অটিজমের জগৎ
অটিজম স্পেকট্রাম ডিসর্ডারের বেলাতেও ঠিক তাই। উপসর্গগুলি বেড়ে ওঠার সময়ে সব শিশুর মধ্যেই কখনো না কখনো দেখা দেয়। কিন্তু যখন তেমনি কিছু উপসর্গ একসঙ্গে একটি শিশুর মধ্যে স্থায়ী ভাবে থেকে যায় এবং তার দৈনন্দিন বা সামাজিক জীবনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা অস্বাভাবিকতার পর্যায়ে পড়ে। এই উপসর্গগুলি নানান বিন্যাস ও সমাবেশে (permutations and combinations) প্রকাশিত হতে পারে। ঠিক যেমন কোনো দুটি মানুষ একরকম নয়, তেমনই কোনো দুটি অটিস্টিক শিশুও একরকম নয়। উপসর্গের এই বিবিধ বৈচিত্র্যের জন্যই এটিকে স্পেকট্রাম ডিসর্ডার বা বর্ণালী রংধনু ব্যাধি বা অবস্থা বলা হয়। আর এই জন্যই কোনো দুজনের চিকিৎসার পদ্ধতিও এক পথে চলে না।
অটিজম শব্দটি এসেছে গ্রীক শব্দ 'অটোস্' (autos) থেকে, যার অর্থ self বা স্ব/নিজ/আত্ম। এই শিশুরা ছোটবেলা থেকে একলা থাকতে ভালবাসে। নিজস্ব একটা জগত গড়ে তাতেই আত্মমগ্ন হয়ে থাকে। সমবয়সীদের সাথে তেমন মেশে না।
নিজেদের ভেতরে যে জগতটি তারা সৃষ্টি করে, সেখানেই যেন তারা বেশ আছে, তার সঙ্গে হয়ত আমাদের চেনা জগতের মিল নেই, তবে কে জানে, হয়ত বা তা অন্য রকম সুন্দর। যেন
"আপনারে দিয়ে রচিলি রে কি এ আপনারই আবরণ
খুলে দেখ দ্বার অন্তরে তার আনন্দনিকেতন"।
হ্যাঁ, সামাজিকতা বা ভাবের আদান-প্রদানে ওদের সমস্যা হয়। পরিবেশ অনুযায়ী মানিয়ে চলায় ওদের অনেক সময় অসুবিধা থাকে। কিন্তু এভাবেও তো ভাবা যায়, যে, এই যে আমরা নিজেদের যে অংশটি সবার সামনে প্রকাশ করতে চাইনা, সেটাকে প্রতিনিয়ত একটা মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে রাখতে চাই, সমাজ দেখে আমাদের মেকি প্রতিচ্ছবি, সেই প্রতারণার তোয়াক্কা করে না ওরা। পৃথিবীর সামনে ওরা দাঁড়ায় সততার স্বচ্ছতা নিয়ে মুখোশ খোলা মানুষ হয়ে। যে সমাজটা আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে পলে পলে, ওদের কাছে তার গুরুত্ব সামান্য। স্বয়ংসম্পূর্ণ এক "গোপন প্রাণের একলা মানুষ" সে।
"বিশ্ব হ'তে থাকি দূরে অন্তরের অন্তঃপুরে
চেতনা জড়ায়ে রহে ভাবনার স্বপ্নজালে"।
নির্ণয় বিধি
American Psychiatric Association বা APA-এর রোগ নির্ণয়ের বৈশিষ্ট্য বা DSM-V (Diagnostic and Statistical Manual for Mental Disorders) এ যে রূপরেখাটি পাই, তা এইরকম –
১। সামাজিক বা পারস্পরিক ভাব বিনিময়ে সমস্যা, কথা কম বলা, ভাব প্রকাশ না করা।
২। দেরীতে কথা বলা, চোখের দিকে না তাকিয়ে কথা বলা, আকার ইঙ্গিত না বোঝা।
৩। পারস্পরিক দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে না পারা।
উপরোক্ত তিনটি উপসর্গই থাকতে হবে। তার সঙ্গে নিম্নোক্ত অন্তত দুটি থাকতে হবে।
১। এক কথা বারবার বলা, অন্যের কথার পুনরাবৃত্তি করা, একই অঙ্গভঙ্গি বারবার করা। যেমন হাততালি দেওয়া, দুলতে থাকা, মাথা ঠোকা, বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকা।
২। নিয়মের গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকার প্রবণতা। একরকমের খাবার, পোশাক, বেড়ানো, কাজ তার মধ্যেই স্বচ্ছন্দ। নিয়মের আদলবদল হলে অস্বস্তি, তার বাইরে যেতে ঘোর আপত্তি, অশান্তি।
৩। কিছু কিছু বাঁধা বিষয়ে অপরিমিত আগ্রহ, কিছু বস্তুর প্রতি অস্বাভাবিক আকর্ষণ।
৪। ইন্দ্রিয়জাত অনুভূতি ও তার বোধ যথাযথ নয়। ব্যথার বোধ কম, কিছু শব্দে অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
এসবই শুরু হয় শিশুকাল থেকে, সাধারণত তিন বছর বয়সের আগে। তীব্রতার তিনটি স্তর –
১। সামান্য সাহায্যের প্রয়োজন।
২। পরিমিত সাহায্যের প্রয়োজন।
৩। সম্পূর্ণ নির্ভরশীল।
প্রথম ইঙ্গিত
৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে লক্ষ্য করা যায় যে শিশুটি চোখের দিকে সরাসরি তাকানো থেকে বিরত থাকে, পরিচিত মুখ দেখে হাসে না, কথা বলার চেষ্টা কম, তার নাম ধরে ডাকলে সে সাড়া দেয় না।
তাদের শারীরিক ভাবে বেড়ে ওঠা বা চলাফেরা নির্দিষ্ট সময় মেনে চলে, কিন্তু সামাজিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে তারা সমবয়সীদের থেকে পিছিয়ে থাকে, বিশেষ করে পারস্পরিক সম্পর্কের জায়গায়।
Theory of Mind বা অন্যের মনস্তত্ব বোঝার ক্ষমতা জন্মায় চার বছরে, যার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে সহানুভূতি বা সহমর্মিতা (empathy)। এই শিশুদের ক্ষেত্রে এই ক্ষমতাটিরও কিছু বিচ্যুতি দেখা যায়।
কিছু সমস্যাজনক বৈশিষ্ট্য –
# অটিজম মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত ভাবে (তিন থেকে চার গুণ) বেশী দেখা যায়। কিন্তু কি কারণে এই সমস্যা দেখা দেয় তা আজও নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। এক লাখে ৩০-৪০ জনের মধ্যে অটিজমের উপসর্গ দেখা যায়।
# এখনো পর্যন্ত, শিশুর জন্মের আগে কোনো পরীক্ষার দ্বারা এটি নির্ণয় করা যায় না।
# অটিজমের কোনো চিকিৎসা নেই। উপসর্গগুলিকে নিয়ন্ত্রণে রাখাটাই শুধু সম্ভবপর।
# অটিজমের অঙ্গ না হলেও, অটিস্টিক শিশুদের মধ্যে এই উপসর্গগুলোর পাশাপাশি আরো অনেকগুলি সমস্যা (comorbidities) প্রায়শই দেখা যায়। যেমন – উদ্বেগ ও বিষন্নতা (anxiety and depression), শুচিবায়ুগ্রস্ততা (Obsessive Compulsive Disorder), অস্থিরতা (Tics, Tourette's Syndrome, ADHD), মৃগীরোগ (Epilepsy), ঘুমের সমস্যা (sleep disorder), পরিপাকতন্ত্রের অসুবিধা (Gastrointestinal disorders) যেমন দুধ বা আটাজাত খাবার হজমে সমস্যা (lactose intolerance, gluten sensitivity).
মানসিক প্রতিবন্ধকতা (Mental Retardation) এটি সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। এই শিশুদের IQ বা বুদ্ধিমত্তা অস্বাভাবিক কম থেকে অস্বাভাবিক বেশী, সব রকমের হতে পারে। যদি তা স্বাভাবিক পর্যায়ে বা তার বেশী থাকে, তাহলে বড় হওয়ার সাথে সাথে শিশুরা নিজেদের সামাজিক অস্বাচ্ছন্দ্য ধীরে ধীরে অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পারে।
এই প্রতিটি অসুবিধার জন্য নির্দিষ্ট ডাক্তার বা থেরাপিস্টদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা খুবই প্রয়োজন। তাই একমাত্র Team work বা দলবদ্ধভাবে সব রকম থেরাপির সাহায্য নিয়েই অটিজমের নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
থেরাপি
শিশুর প্রয়োজন অনুসারে নানান রকম থেরাপি দেওয়া হয়। যেমন –
Speech therapy – কথা বলার অসুবিধার জন্য।
Behaviour therapy (ABA বা Applied Behaviour Analysis) – এর মাধ্যমে শিশুর ব্যবহার স্বাভাবিক করা হয়।
Occupational therapy – পেশাগত সাহায্য।
Vocational therapy – বৃত্তিমূলক বা কারিগরী প্রশিক্ষণ।
Physiotherapy – শারীরিক অক্ষমতা বা দুর্বলতার জন্য।
Sensory intervention – ইন্দ্রিয়জাত অনুভূতি ও তার বোধ স্বাভাবিক করার জন্য।
Medical support – প্রধানত আনুষঙ্গিক সমস্যাগুলির জন্য ওষুধপত্র।
Parental counselling – বাবা-মায়ের কাউন্সিলিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।। শিশুর অবস্থা এবং তার সেই পরিস্থিতিতে কিভাবে এগোনো প্রয়োজন, তা সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হবে। পরিস্থিতির জন্য নিজেদের বা শিশুটিকে দোষারোপ না করা। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সহজ নয়, তাই নিজেদের সুস্থ রাখা অত্যন্ত জরুরী। ক্লান্তি বা burn out-এর হাত থেকে নিজেদের মুক্ত রাখা। কারণ তারাই শিশুগুলির বেড়ে ওঠার কালের প্রধান অবলম্বন বা আশ্রয়।
কিছু অনন্য ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য –
অটিস্টিক শিশুদের অনন্য মানসিক গঠনের জন্য তারা কিছু বিশেষ গুণের অধিকারী হয়।
# কিছু কিছু ভাল লাগার বিষয়ে তাদের গভীর অভিনিবেশ ও ব্যুৎপত্তি জন্মায়। বাবা-মায়ের উচিত সেই বিশেষ বিষয়গুলোকে চিহ্নিত করে সেদিকেই তাদের পরিচালিত করা। বিজ্ঞান, গণিত, সঙ্গীত, আঁকা, লেখা, যে বিষয়ে তাদের মগ্নতা, সেক্ষেত্রে তাদের এগিয়ে দিলে তারা সাফল্য পায়।
# সূক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা। যে ছোটখাট বিচ্যুতি অন্যদের চোখ এড়িয়ে যায়, তা তাদের চোখ এড়ায় না।
# কোনো জটিল বিষয়ের মধ্যে থেকে কিছু চেনা ছক খুঁজে বার করা এবং সেই ভাবে সমাধানের পৌঁছানোর এক সহজাত ক্ষমতা থাকে এদের। অনেক ক্ষেত্রে সেটি প্রথাগত পথের বাইরে। বিজ্ঞানমনষ্কতার জন্য এটি একটি অসামান্য দক্ষতা।
# কাজের প্রতি থাকে নিষ্ঠা ও অধ্যবসায়, তাই এরা অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য কর্মী।
# সততা ও ন্যায়নিষ্ঠতা দৃষ্টান্তমূলক।
পরিশেষ
আমরা যদি অটিজমকে একটি প্রতিবন্ধকতা না ভেবে তাকে একটি 'অনন্য মানসিক অবস্থা' হিসেবে ভাবি, তবেই এই শিশুদের প্রতি সুবিচার করতে পারব। তাদের খামতির চেয়ে জোরের জায়গুলির ওপর মনোনিবেশ করলে, আরো অর্থপূর্ণ সহযোগিতা করতে পারব। তারা যখন কিছু জানাতে চায়, তাদের সাহস দিতে হবে, ধৈর্য্য ধরে বুঝতে চেষ্টা করতে হবে। তাদের আদান-প্রদানের রাস্তাটা প্রশস্ত করে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, তারা আমাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে জীবন কাটাতে চায় না, তারা চায় আত্মসম্মান নিয়ে ঠিক আর পাঁচটি শিশুর মতো বাঁচতে।
"আমারে তুমি করিবে ত্রাণ এ নহে মোর প্রার্থনা –
তরিতে পারি শকতি যেন রয়।
আমার ভার লাঘব করি নাই বা দিলে সান্ত্বনা
বহিতে পারি এমনি যেন হয়"।
পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত মনীষীর ক্ষেত্রেই, তাঁদের জীবনপঞ্জীর উপর ভিত্তি করে, পরবর্তী কালে মনে করা হয়েছে যে তাঁদের মধ্যে অটিজমের লক্ষণ ছিল প্রকট।
বুদ্ধিমত্তায় ঘাটতি না থাকলেও সামাজিক ব্যবহারে ছিল অসঙ্গতি, যা অনেক সময়ে ছাপ ফেলেছিল তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্কেও। সেই তালিকায় আছেন বিশ্ব-বিখ্যাত বিজ্ঞানী, শিল্পী, কবি, কর্পোরেট। হার মানেননি তাঁরা। এগিয়ে গেছেন। একাগ্রতা ও আত্মমগ্নতা দুই মশাল হয়ে আলোকিত করেছে তাঁদের যাত্রাপথ। তাঁরা পথিকৃত হয়ে পথ দেখিয়েছেন মানবজাতিকে।

পরিচিতি: প্রাবন্ধিক ও বিশিষ্ট চিকিৎসক। কলকাতা।