
বর্তমানে মহিলাদের ক্রীড়াক্ষেত্রে অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একজন মহিলা অ্যাথলেটের ক্রীড়া-দক্ষতা শুধু প্রশিক্ষণ, প্রতিভা ও পরিশ্রমের উপর নির্ভর করে না; হরমোনীয় স্বাস্থ্য, বিপাকীয় অবস্থা, পুষ্টি, ঘুম, মানসিক চাপ ও মাসিকচক্রও গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রসঙ্গে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর উপস্থিতিতে ক্রীড়া-দক্ষতার উপর প্রভাব পড়তে পারে কিনা এবং বিভিন্ন খেলায় সেই প্রভাব একই কিনা — এই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।
পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (Polycystic Ovary Syndrome - PCOS) কী?
পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম শুধু ডিম্বাশয়ে ছোট ছোট সিস্ট থাকার সমস্যা নয়; এটি একটি অন্তঃস্রাবীয়-বিপাকীয় ব্যাধি। সাধারণ বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে মাসিক অনিয়ম, ডিম্ব স্ফোটনে সমস্যা, অ্যান্ড্রোজেনের মাত্রা বৃদ্ধি, অতিরিক্ত লোম, ব্রণ, ওজন বা দেহ-গঠনের পরিবর্তন, ইনসুলিন প্রতিরোধ এবং কিছুক্ষেত্রে প্রজননক্ষমতা-সংক্রান্ত সমস্যা। তবে সব মহিলার উপসর্গ একই নয় এবং নিয়মিত ব্যায়ামকারী অ্যাথলেটদের ক্ষেত্রে উপসর্গ আলাদাভাবে প্রকাশ পেতে পারে।
পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম ও মহিলা অ্যাথলেট
অ্যাথলেটরা প্রশিক্ষণ, প্রতিযোগিতা, খাদ্যগ্রহণের সীমাবদ্ধতা, ভ্রমণ, ঘুমের পরিবর্তন ও মানসিক চাপের কারণে উল্লেখযোগ্য শারীরিক চাপের মধ্যে থাকেন। পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমের হরমোনীয় ও বিপাকীয় পরিবর্তনের সঙ্গে এগুলির সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে মাসিক অনিয়মকে শুধু পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমের ফল ধরে নেওয়া ঠিক নয়; অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত খাদ্যগ্রহণের অভাব ও কম শক্তি-উপলব্ধতাও কারণ হতে পারে। তাই যথাযথ চিকিৎসা বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন জরুরি।
বিভিন্ন খেলায় প্রভাব
পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমের প্রভাব সব খেলায় একই নয়। সহনশীলতাভিত্তিক ক্রীড়ায় বায়বীয় সক্ষমতা ও দীর্ঘক্ষণ কাজের ক্ষমতা, শক্তিভিত্তিক ক্রীড়ায় সর্বাধিক এবং দলগত ক্রীড়ায় সহনশীলতা, দ্রুত দৌড়, ত্বরণ, লাফ ও ক্ষিপ্রতা গুরুত্বপূর্ণ।
সহনশীলতাভিত্তিক ক্রীড়া
দীর্ঘ দূরত্বের দৌড়, সাইক্লিং ও সাঁতারের মতো খেলায় সর্বোচ্চ অক্সিজেন গ্রহণ ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত সহনশীলতা প্রশিক্ষণ হৃদ্-রক্তনালীয় সুস্থতা ও ইনসুলিন সংবেদনশীলতা উন্নত এবং দেহ-গঠন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। তবে ইনসুলিন প্রতিরোধ বা অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত দেহগঠন থাকলে বিপাকীয় প্রতিক্রিয়া পরিবর্তিত হতে পারে; তাই ব্যক্তিগত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ।
শক্তিভিত্তিক ক্রীড়া
পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমের অ্যান্ড্রোজেন-পরিবর্তন কঙ্কালপেশিতে প্রভাব ফেলতে পারে। শক্তিভিত্তিক অ্যাথলেটদের পেশিভর বেশি হওয়ায় দেহভর সূচকও বেশি হতে পারে; তাই শুধু দেহভর সূচক দেখে অতিরিক্ত ওজন বা বিপাকীয় দুর্বলতা নির্ধারণ করা উচিত নয়।
একটি তুলনামূলক গবেষণায় ৯০ জন মহিলা অ্যাথলেটের মধ্যে ৩০ জন সহনশীলতাভিত্তিক, ৩০ জন শক্তিভিত্তিক এবং ৩০ জন দলগত ক্রীড়াবিদ ছিলেন। মোট ২৮ জনের পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম শনাক্ত হয়; সামগ্রিক প্রাদুর্ভাব ৩১.১%। শক্তিভিত্তিক ক্রীড়াবিদদের হার ৪০%, সহনশীলতাভিত্তিকদের ২৩.৩% এবং দলগত ক্রীড়াবিদদের ৩০%। তবে এই আড়াআড়ি পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা থেকে কারণ-ফল সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
দলগত ক্রীড়া
ফুটবল, বাস্কেটবল, ভলিবল ও হকির মতো খেলায় বায়বীয় ও অবায়বীয় কাজ একসঙ্গে করতে হয়। দৌড়, ত্বরণ, গতিহ্রাস, লাফ ও দ্রুত দিক পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। তাই পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমের সঙ্গে দেহ-গঠন ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। উল্লিখিত গবেষণায় এই গোষ্ঠীতে প্রাদুর্ভাব ছিল ৩০%।
পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম কি ক্রীড়া-দক্ষতা কমিয়ে দেয়?
পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম থাকা মানেই একজন মহিলা অ্যাথলেট দুর্বল বা কম দক্ষ — এমন ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। ক্রীড়া-দক্ষতা প্রশিক্ষণ, পুষ্টি, বংশগত বৈশিষ্ট্য, দেহের গঠন, হরমোনীয় স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার, মানসিক স্বাস্থ্য ও ঘুম সহ বহু বিষয় নির্ভর করে। যথাযথ প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম থাকা অ্যাথলেটও উচ্চপর্যায়ের ক্রীড়া-দক্ষতা অর্জন করতে পারেন।
ক্রীড়া-দক্ষতার সম্ভাব্য প্রভাব
পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমের সঙ্গে স্থূলতা ও ইনসুলিন প্রতিরোধ থাকলে হৃদ্-রক্তনালীয় সুস্থতা ও বিপাকীয় দক্ষতা প্রভাবিত হতে পারে; তবে নিয়মিত বায়বীয় প্রশিক্ষণ তা উন্নত করতে পারে। অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত দেহগঠন থাকলে দ্রুত দৌড় ও লাফে ত্বরণ ও চলন-দক্ষতা প্রভাবিত হতে পারে, যদিও শক্তি ও স্নায়ু-পেশীয় প্রশিক্ষণে তা উন্নত করা সম্ভব। দলগত ক্রীড়ায় অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত দেহগঠন দ্রুত ত্বরণ ও দিক পরিবর্তনের যান্ত্রিক চাহিদা বাড়াতে পারে।
শরীরের ওজন ও মাসিকচক্র
অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার সম্পর্ক থাকলেও অ্যাথলেটদের ক্ষেত্রে বেশি ওজন মানেই বেশি চর্বি নয়। বিশেষ করে শক্তিভিত্তিক ক্রীড়াবিদদের পেশিভর বেশি হওয়ায় দেহভর সূচক বেশি হতে পারে। তাই দেহের চর্বির শতকরা হার, চর্বিহীন দেহভর, কোমরের পরিধি, খাদ্যগ্রহণ ও বিপাকীয় প্রোফাইলও বিবেচনা করা উচিত।
মাসিক অনিয়ম পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমের পাশাপাশি অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত ক্যালরি গ্রহণের অভাব ও কম শক্তি-উপলব্ধতার কারণেও হতে পারে। দীর্ঘদিন অনিয়ম থাকলে প্রজনন স্বাস্থ্যের পাশাপাশি অস্থি স্বাস্থ্য ও সামগ্রিক শারীরবৃত্তীয় স্বাস্থ্য প্রভাবিত হতে পারে।
পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম থাকা অ্যাথলেটদের জন্য করণীয়
নিয়মিত বায়বীয় ব্যায়াম — দৌড়, সাইক্লিং ও সাঁতার হৃদ্-রক্তনালীয় ও বিপাকীয় স্বাস্থ্য উন্নত করতে পারে।
প্রতিরোধমূলক শক্তি প্রশিক্ষণ — পেশিশক্তি ও চর্বিহীন দেহভর বৃদ্ধিতে সহায়ক।
সুষমখাদ্য — পর্যাপ্ত প্রোটিন, জটিল শর্করা, স্বাস্থ্যকর চর্বি, ভিটামিন ও খনিজ; অত্যধিক ক্যালরি সীমাবদ্ধতা এড়ানো উচিত। পর্যাপ্ত পুনরুদ্ধার — ঘুম ও বিশ্রাম গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা — প্রয়োজনে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, অন্তঃস্রাব বিশেষজ্ঞ, ক্রীড়া চিকিৎসক, ক্রীড়া শারীরবিজ্ঞানী ও পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কোচ ও ক্রীড়াবিজ্ঞানীদের ভূমিকা
কোচের দায়িত্ব শুধু ক্রীড়া-দক্ষতা বৃদ্ধি নয়, অ্যাথলেটের সামগ্রিক স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণও। দীর্ঘদিন মাসিক অনিয়ম, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, দ্রুত ওজন বৃদ্ধি, অতিরিক্ত ব্রণ বা লোমের বৃদ্ধি কিংবা ক্রীড়া-দক্ষতার অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমের কারণে অ্যাথলেটকে সামাজিক ভাবে আলাদা না করে ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করা উচিত।
গবেষণার ফলাফল
তুলনামূলক গবেষণায় সহনশীলতা, শক্তি ও দলগত ক্রীড়ায় পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমের প্রাদুর্ভাব যথাক্রমে ২৩.৩%, ৪০% ও ৩০% পাওয়া গেছে। এটি নির্দেশ করে যে মহিলা ক্রীড়াবিদদের স্বাস্থ্যকে ক্রীড়া-নির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা প্রয়োজন। তবে প্রাদুর্ভাবের পার্থক্য দেখেই কোনও নির্দিষ্ট ক্রীড়া পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম সৃষ্টি করে বলা যায় না। কারণ-ফল সম্পর্ক নির্ধারণে বৃহত্তর নমুনা, দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা এবং হরমোনীয় ও বিপাকীয় পরিমাপ প্রয়োজন।

পরিচিতি: অধ্যাপক ও বিশিষ্ট ক্রীড়া বিজ্ঞানী।