
গ্রাম্য গীতিকার পালাগানের শুরুতেই থাকে বন্দনা। বন্দনায় যেমন থাকে দিক্ বন্দনা:
পূবেতে বন্দনা করলাম পূবের ভানুশ্বর
একদিকে উদয়রে ভানু চৌদিকে পশর।...
ঠিক তেমনি থাকে সভার বন্দনা — পল্লী বাংলার সভা হিন্দু-মুসলিমের মিলিত সভা।
সভা কইর্যা বইছ ভাইরে হিন্দু-মুসলমান
সভার চরণে আমি জানাইলাম সেলাম।
সেই সুরেরই রেশ টেনে প্রধান গায়ক বা বয়াতী গাইতে থাকেন —
হেদু আর মোছলমান এক্কই পিণ্ডর দড়ি
কেহ বলে আল্লা রসুল কেহ বলে হরি।
বিছমিল্লা আর গিরিবিষ্টু একুই গেয়ান
দোফাক করি দিয়ে পরভূ রাম রহমান।
পাণ্ডা পুরোহিত, মোল্লা শাসিত সামন্ত সমাজের আনুষ্ঠানিক ধর্মের আচার বিচার যখন আমাদের কৃষিজীবী খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে বিভেদের ও বিচ্ছেদের বীজ বপন করেছে, জনসাধারণের কবি তখন বিপরীত জীবনদর্শন প্রচার করে ঐক্য ও সমন্বয়ের বাণী প্রচার করেছেন।
অজানা মুসলমান গ্রাম্যকবি গাজির গীতে গেয়েছেন:
নানা বরণ গাভীরে তার একই বরণ দুধ
জগত ভরমিয়া দেখলাম একই মায়ের পুত।
গ্রামবাংলায় কৃষিজীবী নিরক্ষর মানুষের কাছে গ্রামের কবি এমনি এক মহান বিশ্বমানবতার বাণীকে এমন সহজ অথচ সুগভীর আবেগে প্রচার করেছেন।
মোল্লা মওলানার শরীয়ত শাসন কিংবা সনাতন ব্রাহ্মণ্যধর্মের মনুর বিধানকে অবজ্ঞা করে, সমাজপতিদের লাঞ্ছনাকে অগ্রাহ্য করে, বৈষ্ণব, সুফী ও সহজিয়া বাউলের ভাবধারার সংমিশ্রণে এক অপূর্ব মানবতত্ত্ব গড়ে উঠেছিল। জাতপাত আচার-বিচারের শুকনো বালুচরে তাদের এই নবভাবের বন্যায় যে মানবধর্মের পলিমাটি পড়েছিল তাতে আমাদের পল্লীপ্রান্তর সবুজ প্রাণের ফসলে ভরে উঠেছিল। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের এই নিরক্ষর দার্শনিকদের কথা ভাবলেই প্রথমে মনে পড়ে মুসলমান কবিদের কথা — শানাল ফকির, সেখ মদন, শরীয়তী শাহ প্রভৃতি নাম শিক্ষিত শহুরে সমাজে আজও পরিচিত। কিন্তু কত ছোট জ্ঞাত-অজ্ঞাত লোককবি দেহের খাঁচার মধ্যে হীরামন পাখির সন্ধান দিয়ে মানবদেহকে পবিত্রতম ঘোষণা করে স্বর্গ ও বেহেশতের ওপরে স্থান দিয়ে গেছেন তার ইয়ত্তা নেই। সৃষ্টিতত্ত্বের শরীয়তী ধারণাকে ওলটপালট করে যখন মুসলমান পল্লী কবি হাছন রাজা বলেন,
আমার আংখি হইতে পয়দা হইল আসমান জমিন
কিংবা হিন্দু কবি মনোমোহন বলেন:
মনোমোহন কয় পেরেশন
পুজে হিন্দু মুসলমান
তড়িকৎ মঞ্জিল কইরে আপনে হজরত।
অর্থাৎ প্রেমের পথে নিজের দেহের মঞ্জিলেই হজরতের সন্ধান মেলে। সাম্প্রদায়িক শাসনক্লিষ্ট সমাজে এর ঐক্যসাধনকারী তাৎপর্য ছিল অপরিসীম। শুধু দেহতত্ত্ব নয়, হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে কৃষিজীবী গ্রাম্য বাংলার ভিজে মাটি ও সজল হাওয়ার আবেগের একটি সর্বজনীন পরিমণ্ডল সৃষ্টি হয়েছিল। আরবের কারবালার ফাতেমার চোখের পানি আর বাংলার নিমাই সন্ন্যাসে শচীমাতার বেদনাশ্রু এক মোহানায় মিশে গেছে। হোসেনের ঘোড়াকে সম্বোধন করে ফতেমার বুকফাটা বিলাপ:
ও ঘোড়া দুলদুলরে দুলদুল
ফিরিয়া আয় ঘরে
আইজের রণ জিতত্যা আইলে
সোনা দিমু তোরে।
কিংবা শচীমাতার আকুতি:
ওরে ও নগরবাসী তোমরানি কেহ দেইখাছ নিমাইরে
তোমরানি দেইখাছ নিমাইরে
আমার প্রাণের বাছারে।
সন্ন্যাসী না হইওরে নিমাই
বৈরাগী না হইও।
ঘরে এসে অভাগীরে মা বলে ডাকিও নিমাইরে...
মুর্শিদ মোজাহেদ চান্দে যখন গান —
তোর গৈরবে আমরা গৈরবিনী গো ফাতিমা মা
আবার শেখ মুন্সী সেই সুরে যখন গলা মেলান "আমার শচীর দুলাল গৌরবে" — তখন বিরহ বিধুরা বাংলার ব্যথিত প্রাণের তন্ত্রীতে একই আবেগের কম্পন তোলে আজ।
হাসানের বেটা কাসেমের বিবির যে বিলাপ —
যাইও না যাইও না নাথ আমারে ছাড়িয়া
যুদ্ধে যাইতে ছিল সাধ কেনে করলা বিয়া
তার সঙ্গে ঘরের বধূ বিষ্ণুপ্রিয়ার যে আর্তনাদ — "শচীমাতা গো আমি চার জন্মে হই জন্ম দুঃখিনী" — এই দুয়ে মিলে গ্রাম্য বাংলার হাওরে বিলে বারে বারে যে ভাবের ঢেউ উঠেছে, কাটা গাঙের ঘোলাজল তাকে কি ডুবিয়ে দিতে পারে?
এই ভাবের প্রবাহে বাউল কবিদের দান অসামান্য।
বাউল বলতে এক কথায় আমরা যা বুঝি তা বাংলার সুফী আর বাউলা সাধনার ধারার সমন্বয়ে সৃষ্ট জীবনদর্শন। এই বাউল ও সুফীরা যে মানুষের সন্ধানী হয়েছিলেন তা আপাতদৃষ্টিতে গূঢ় তত্ত্বের ব্যাপার হলেও সামাজিক দৃষ্টিতে তা ছিল জাত-পাত, ধর্মের ওপরে মানবতার প্রতিষ্ঠা। সেই নবমানবতা বাংলার পল্লীসংস্কৃতিকে সেদিন এক নতুন প্রাণে সঞ্জীবিত করেছিল। আজ বাউলসংগীতের সাধক এবং গবেষকরা তার তত্ত্ব নিয়ে মত্ত। কিন্তু তত্ত্বের ব্যাপার হলে তা লোকসংগীতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারতো না। তার সমাজসত্য, সহজ করে দেখা ও গভীর অনুভূতিই লোকমানসে ভাবের ঢেউ তুলেছিল। রবীন্দ্রনাথ তাই মহম্মদ মনসুরউদ্দীনের 'হারামণি'র ভূমিকায় লিখেছেন: "আমাদের দেশে যাঁরা নিজেদের শিক্ষিত বলেন তাঁরা প্রয়োজনের তাড়নায় হিন্দু-মুসলমানের মিলনের নানা কৌশল খুঁজে বেড়াচ্ছেন। অন্য দেশের ঐতিহাসিক স্কুলে তাঁদের শিক্ষা। কিন্তু আমাদের দেশের ইতিহাস আজ পর্যন্ত প্রয়োজনের মধ্যে নয়, পরন্তু মানুষ ও অন্তরতর গভীর সত্যের মধ্যে মিলনের সাধনাকে বহন করে এসেছে। বাউল সাহিত্যে বাউল সম্প্রদায়ের সেই সাধনা দেখি, এ জিনিস হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই। তারা একত্র হয়েছে অথচ কেউ কাউকে আঘাত করেনি। এই মিলনে সভা-সমিতির প্রতিষ্ঠা হয়নি, এই মিলনে গান জেগেছে। এই গানের ভাষা ও সুর অশিক্ষিত মাধুর্যে সরস। বাঙলা দেশের গ্রামের গভীর চিত্তে উচ্চ সভ্যতার প্রেরণা, স্কুল কলেজের অগোচরে আপনা-আপনি কী রকম কাজ করে এসেছে, হিন্দু-মুসলমানের জন্য এক আসন রচনার চেষ্টা করেছে, এই বাউল গানে তারই পরিচয় পাওয়া যায়।"
যশোহরের পাঞ্জু শাহ ছিলেন তেমনি এক সুফী বাউল। গোঁড়া সমাজপতিদের দ্বারা নিগৃহীত হয়ে গেয়েছিলেন:
জেতের বড়াই কি,
ইহকালে পরকালে জেতে করে কি।
আমার মন বলে অগ্নি জ্বেলে দিই জেতের মুখি,
এক জেতের বোঝা লয়ে
চিরকাল কাটালাম মানী মানুষ হয়ে,
মানের গৌরব, কুলের গৌরব
ধন্ধবাজি সব দেখি।
লোকে পেটের জ্বালায় দেশান্তরী হয়,
হিন্দু-মুসলমানের বোঝা মাথায় করে রয়,
কার বা জাতে কেবা দেখে ঘরে এল চিহ্ন কি।
"আমার মন বলে অগ্নি জ্বেলে দিই জেতের মুখি" — বাউল তত্ত্বের অন্তরাল থেকে ক্রোধে অভিমানে বেরিয়ে আসা এই গান মনে করিয়ে দেয় বিদ্রোহী কবি নজরুলের — "জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত জালিয়াত খেলছে জুয়া"। কিন্তু এবিষয়ে লালন শাহের তুলনা নেই। আমাদের অতি পরিচিত মরমীয়া লালন ফকির সমাজের অতি নীচুতলা থেকে ওপর তলার বিভেদকারী ধর্মবুদ্ধিকে তীব্র চাবুক হেনেছেন। হিন্দু-মুসলমানের ঊর্ধ্বে এক মানবধর্ম প্রতিষ্ঠা ছিল তাঁর সাধনা।
ফকিরি করবি ক্ষেপা কোন রাগে,
আছে হিন্দু-মুসলমান দুই ভাগে।
থাকে ভেস্তের আশায় মমিনগণ,
হিন্দুরা দেয় স্বর্গেতে মন,
ভেস্ত স্বর্গ ফাটক সমান
— কার বা তা ভালো লাগে।
তারপরেই তাঁর জীবনদর্শন যে মানবতত্ত্ব তা অতি পরিষ্কারভাবে প্রচার করেছেন:
মানবতত্ত্ব যার সত্য হয় মনে
সে কি অন্য তত্ত্ব মানে।
মাটির ডিপি কাঠের ছবি
ভূতভাবে সব দেবাদেবী,
ভোলেনা সে এসব রূপী
ও যে মানুষ রতন চেনে।
জিন ফেরেস্তার খেলা
পেঁচাপেঁচি আলা ভোলা
তার নয়ন হয়না ভোলা
(ও সে) মানুষ ভজে দিব্যজ্ঞানে। ইত্যাদি
পারস্যের যে কবি শরীয়তের শাসনকে অবজ্ঞা করে একদিন বলেছিলেন 'আনালহক', 'আমিই সত্য'এবং তদানীন্তন ধর্মজীবীদের দ্বারা আগুনে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন, গল্পে আছে, তাঁর ছাইয়ের সঙ্গে আনাল হক ধ্বনি বাতাসে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলার মাটিতে সে ছাই এসে লালনের মতো বহু কবির জন্ম দিয়েছে। সামন্ত সমাজের অচলায়তনের মধ্যে এই ফকিরেরা গণচেতনার নির্ভুল ফরমান। তাই সাধারণ মানুষের মধ্যে এই জীবনদর্শন এমনি ছড়িয়ে পড়েছিল।
আমাদের দেশের সর্বধর্মসমন্বয়বাদীদের চেয়ে এই বাউলরা ছিলেন অনেক অগ্রসর। সমন্বয়বাদীদের মন্দির গীর্জায় মসজিদে সর্বত্রই সত্য আছে, এরা দেবাদেবী, জিন ফেরেশতা সবই সত্য বলে জোড়াতালি তত্ত্ব দিয়ে সমন্বয় সাধনের ব্যর্থ চেষ্টা করেছেন।
কিন্তু সহজিয়া সুফি বাউলরা সে তুলনায় ছিলেন বিপ্লবী। তাঁরা মন্দির মসজিদ মার্কা ধর্মে অনাস্থা প্রকাশ করেছেন।
মদন বাউল অত্যন্ত জোরালো ভাষায় গেয়েছেন:
তোমার পথ ঢেক্যাছে মন্দির মসজিদে
ও তোর ডাক শুনে সাঁই চলতে না পাই
আমায় রুখে দাঁড়ায় গুরুতে, মুরশেদে।
কিংবা
মোর যাইতে তো চায় না মন মক্কা-মদিনা
বন্ধু আমার কাছে আমি রইব তারি কাছে,
পাগল হইতাম ঘরে রইতাম
তারে চিনতামরে যদি না।
(আমার) নাই মন্দির কি মসজিদ
নাই পূজা কি বকরিদ
তিলে তিলে মোর মক্কা কাশী
পলে পলে সুফিনা।
যাঁরা বাউলতত্ত্ব আলোচনা করেন, ঈড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্নার ত্রিবেণী সঙ্গমের কিংবা সুফিদের আবহায়াতের নির্ঝরিণীর গুহ্যধারার সন্ধান বিশ্লেষণ করেন, তাঁরা এই তত্ত্বের সামাজিক ও মানবিক তাৎপর্যের এদিকটাকে অবহেলা করে যান। বরঞ্চ 'হিন্দুধারা' ও 'মুসলিম ধারা'র অনুসন্ধান করে লোকসংগীতের এই সবল ঐতিহ্যকে অবজ্ঞা করে পরোক্ষভাবে সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশয় দেন।
কিন্তু মাটির ঢিপি আর কাঠের ছবি বা জিন ফেরেশতার শাসন সমাজে আজও অব্যাহত হয়ে রইল। কারণ সামন্ত সমাজেরই ক্ষুধিত পাষাণের ওপর গজিয়ে উঠল বিদেশি মূলধনের মুৎসুদ্দীদের মোতিমহল। এখানে এ আলোচনায় ঢুকতে চাই না।
বাউলদের মানবতাবাদ হয়তো আজকের সমস্যা সমাধানের পথে সাম্প্রদায়িকতার দুষ্ট ব্রণের ওপর অস্ত্রোপচারে অসমর্থ। সেজন্য চাই জনতার শ্রেণিসংগ্রামের নতুন জীবনদর্শন। কিন্তু আমাদের পল্লীকবিদের বলিষ্ঠ ঐতিহ্যের ওপরেই গড়ে উঠবে এই নতুন জীবনবেদ।
(বানান অপরিবর্তিত)
[সৌজন্যে: 'শিল্পীযোদ্ধা: হেমাঙ্গ বিশ্বাস', নির্বাচিত প্রবন্ধ ও স্বরলিপি সহ গানের সংকলন, জনমত, গুয়াহাটি-৭৮১০১১।]
পরিচিতি: গণসংগীত ও লোকসংগীতের এক উজ্জ্বল পথিকৃৎ, অসামান্য গীতিকার ও সুরকার, লেখক এবং গণনাট্য আন্দোলনের অগ্রণী নেতা।