প্রবন্ধ ও নিবন্ধ

ঝরো ঝরো মুখর বাদর দিনে



সন্দীপ দে


"নীল নবঘনে আষাঢ়গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে।
ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।
বাদলের ধারা ঝরে ঝরো-ঝরো, আউষের ক্ষেত জলে ভরো-ভরো,
কালিমাখা মেঘে ও পারে আঁধার ঘনিয়েছে দেখ্‌ চাহি রে।
"...

ছেলেবেলায় রবীন্দ্রনাথের এই কবিতা বা গানটি শুনলে মনটা সংগোপনেই নেচে উঠত। না, রবীন্দ্রনাথের বর্ষার রূপবর্ণনায় মুগ্ধ হয়ে কিন্তু একেবারেই নয়, মনে খুশির পরশ লাগত হঠাৎ করে বাড়তি একটা ছুটির দিন উপহার হিসেবে পাবার আনন্দের কথা ভেবে। কবির এই রচনাটির প্রতিটি শব্দেই যেন একটা ছুটির আমেজ খুঁজে পেতাম। বিশেষ করে স্কুলে না যাবার আনন্দটা যেন জাঁকিয়ে বসত। রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ঋতু বর্ষা। এই বর্ষা নিয়ে কবির বিশেষ অনুভব, উচ্ছ্বাসও সৃষ্টির অন্তনেই। বর্ষার প্রতি কি তাঁর একটু বেশিই পক্ষপাতিত্ব ছিল? তিনি 'জীবনস্মৃতি'র পাতায় তাঁর ছেলেবেলার বর্ষার স্মৃতি অপরূপভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন:

"বাল্যকালের দিকে যখন তাকাইয়া দেখি তখন সকলের চেয়ে স্পষ্ট করিয়া মনে পড়ে তখনকার বর্ষার দিনগুলি। বাতাসের বেগে জলের ছাঁটে বারান্দা একেবারে ভাসিয়া যাইতেছে, সারি সারি ঘরের সমস্ত দরজা বন্ধ হইয়াছে, প্যারী বুড়ি কক্ষে একটা বড়ো ঝুড়িতে তরি-তরকারি বাজার করিয়া ভিজিতে ভিজিতে জলকাদা ভাঙিয়া আসিতেছে, আমি বিনা কারণে দীর্ঘ বারান্দায় প্রবল আনন্দে ছুটিয়া বেড়াইতেছি। আর, মনে পড়ে, ইস্কুলে গিয়াছি; দর্‌মায়-ঘেরা দালানে আমাদের ক্লাস বসিয়াছে; অপরাহ্নে ঘনঘোর মেঘের স্তূপে স্তূপে আকাশ ছাইয়া গিয়াছে; দেখিতে দেখিতে নিবিড়ধারায় বৃষ্টি নামিয়া আসিল; থাকিয়া থাকিয়া দীর্ঘ একটানা মেঘ-ডাকার শব্দ; আকাশটাকে যেন বিদ্যুতের নখ দিয়া একপ্রান্ত হইতে আর-একপ্রান্ত পর্যন্ত কোন্‌ পাগলি ছিঁড়িয়া ফাড়িয়া ফেলিতেছে; বাতাসের দম্‌কায় দর্‌মার বেড়া ভাঙিয়া পড়িতে চায়; অন্ধকারে ভালো করিয়া বইয়ের অক্ষর দেখা যায় না, পণ্ডিতমশায় পড়া বন্ধ করিয়া দিয়াছেন; বাহিরের ঝড়-বাদলটার উপরেই ছুটাছুটি-মাতামাতির বরাত দিয়া বদ্ধ ছুটিতে বেঞ্চির উপর বসিয়া পা দুলাইতে দুলাইতে মনটাকে তেপান্তরের মাঠ পার করিয়া দৌড় করাইতেছি। আরও মনে পড়ে শ্রাবণের গভীর রাত্রি, ঘুমের ফাঁকের মধ্য দিয়া ঘন বৃষ্টির ঝম্‌ ঝম্‌ শব্দ মনের ভিতরে সুপ্তির চেয়েও নিবিড়তর একটা পুলক জমাইয়া তুলিতেছে; একটু যেই ঘুম ভাঙিতেছে মনে মনে প্রার্থনা করিতেছি, সকালেও যেন এই বৃষ্টির বিরাম না হয় এবং বাহিরে গিয়া যেন দেখিতে পাই আমাদের গলিতে জল দাঁড়াইয়াছে এবং পুকুরের ঘাটের একটি ধাপও আর জাগিয়া নাই।"

এই অসাধারণ বর্ণনার পাশাপাশি আমরা লক্ষ করি তাঁর লেখনীতে নিঃসৃত হয়েছে অপরূপ বাণীতে, অনুপম সুরে ও ছন্দে এবং বর্ষার অসাধারণ চিত্রকল্পে রচিত গান:

"নীল-অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায় সম্‌বৃত অম্বর হে গম্ভীর!
বনলক্ষ্মীর কম্পিত কায়, চঞ্চল অন্তর —
ঝঙ্কৃত তার ঝিল্লির মঞ্জীর হে গম্ভীর।।
বর্ষণগীত হল মুখরিত মেঘমন্দ্রিত ছন্দে,
কদম্ববন গভীর মগন আনন্দঘন গন্ধে —
নন্দিত তব উৎসবমন্দির হে গম্ভীর।।
"...

এটি আমারও একটি অন্যতম প্রিয় গান। তবে কবির সঙ্গে আমার কিঞ্চিৎ অমিলও রয়েছে। আমার কাছে রিমঝিম রিমঝিম বর্ষার ভালো লাগা দিক অনেক থাকলেও কিছু বিপরীত খারাপ লাগার দিকও আছে। বর্ষণধারায় প্রকৃতি শান্ত শীতল হলেও গরমের দাপটটা কিন্তু পুরোপুরি যায় না। তাছাড়া জলকাদায় প্যাচপেচে রাস্তায় যাতায়াতে অসুবিধে, বৃষ্টির মধ্যে জানালা বন্ধ লাইন বাসের মধ্যে ভ্যাপসা গরমে ঠাসাঠাসি ভিড়ে ভেজা ছাতা, ব্যাগ সামলে যাতায়াতের অভিজ্ঞতা কিন্তু মোটেও সুখকর নয়। এছাড়া তখন রাস্তার নর্দমা বুজে গিয়ে যাবতীয় বর্জ্যপদার্থ মিশ্রিত জলে পা ডুবিয়ে চলা বা কোথাও হাঁটুডোবা জল মাড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো এক চরম দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা। এই সময় কেমন যেন একটা মনখারাপ করা পরিবেশ থাকে। বৃষ্টির প্রকোপে অনেক সময়ই বাইরের জগৎ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে গৃহবন্দি রাখা ছাড়া আর উপায় থাকে না। ভালো জামাকাপড়গুলো নষ্ট হবার ভয়ে বাক্সবন্দি হয়ে থাকে। এই সময়ে খাবারদাবারেও বৈচিত্র্য খুব একটা থাকে না। সামাজিক আনন্দ অনুষ্ঠান সব তোলা থাকে পরবর্তী সব ঋতুর জন্য। আমার বর্ষার এই অসুখী অভিজ্ঞতা অবশ্য কলকাতা শহরের। আমাদের ছেলেবেলার অসমের ছোট্ট শহরের অভিজ্ঞতা কিন্তু ভিন্ন।

বাদলা হাওয়ায় মনে পড়ে ছেলেবেলার গান

অসমের ছোট্ট মফস্‌সল শহর বিলাসীপাড়ায় শৈশব-কৈশোর এবং যৌবনের সন্ধিক্ষণে বর্ষার অভিজ্ঞতা ছিল বিচিত্র। আজ স্মৃতির পাতা ওলটালে দেখা যায় কিছু খারাপ লাগা ছিল বটে, কিন্তু ভালো লাগার পাল্লাই ছিল বেশ ভারি। চারদিকে গ্রাম ও চর অঞ্চল পরিবেষ্টিত শহর। শহরের বুকে যেমন ইতস্তত গাছের সারি, তেমনি সংলগ্ন অঞ্চল জুড়ে সর্বত্র গাছগাছালি, বিস্তীর্ণ ফসলের খেত, বড়ো বড়ো ডোবা, নালা, পুকুর। ঘন বর্ষার সময়টুকু বাদ দিলে সবুজ ধানের খেতে মৃদুমন্দ হাওয়ার দোলা, শীতে শিশিরভেজা সরষে খেতের গাঢ় হলুদ বর্ণচ্ছটা ও তার গন্ধের মাদকতা, শরৎকালে নদীর পারে সাদা মেঘের মতো কাশবনের বাহার — সব মিলিয়ে এক অনাবিল মুগ্ধতার আবহ রচনা করত। বাড়তি সৌন্দর্য ছিল শহর ঘেঁষে বয়ে চলা গৌরাঙ নদী। ব্রহ্মপুত্রের এই শাখা নদীটি ছিল শহর ও সংলগ্ন অঞ্চলের যেন প্রাণস্পন্দন। ব্যবসা, যোগাযোগ সহ নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিনতা অনেকটাই নির্ভর করত এই নদীর ওপর।

বর্ষায় এই শান্ত নদীটির রূপ যেত পালটে। জলস্তর বেড়ে গিয়ে প্রায় রাস্তা ছুঁয়ে ফেলত, তখন ধীরে চলা নদীর চঞ্চলা স্রোত বইতে দেখা যেত প্রবলবেগে — কবির বাণীতে 'ভরা নদী ক্ষুরধারা খরপরশা'। এই সময় বৃষ্টি থেমে যাবার পর বিকেলে যখন হালকা রোদের আভা দেখা যেত, তখন নদীর পারে দাঁড়ালে ওপারে দূর আকাশের গায়ে ফুটে উঠত অপরূপ রামধনু ছটা। দেখে এক অদ্ভুত ভালোলাগার অনুভূতি হতো। নদীর বুকে মাঝে মাঝে দেখা যেত ছোটো ছোটো শুশুকের আনন্দে ডিগবাজি খাওয়া, নদীর দুপারে এবং নদীর বুকে নৌকায় মাছ ধরায় ব্যস্ত মাঝিরা। তখন মাটির হাড়ি, কলসি, মনিহারি সামগ্রী নিয়ে নানা প্রান্তে গাওয়াল করতে যাওয়া কিছু মানুষ (ওদের বলা হতো ছান্দার, যারা মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত) তাদের নৌকাগুলি পারে ভিড়িয়ে রাখত, কারণ তখন তো খদ্দের গ্রামবাসীরা এসব জিনিস কেনার অবস্থায় নেই, তারা জলের প্রকোপে বিপর্যস্ত। ওই সময়ে নদীর পারের এইসব দৃশ্য মন কেড়ে নিত।

বেশ কিছুকাল পরে এই প্রিয় নদীটি আপন খেয়ালে তার গতিপথ পরিবর্তন করে আমাদের দৃষ্টির সীমান্ত থেকে একেবারে বিলীন হয়ে গেল! পড়ে রইলো তার শুকিয়ে যাওয়া গতিপথ ও শূন্য তটভূমি! রিক্ত করে দিয়ে গেল শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য-সম্ভার, স্তব্ধ হয়ে গেল শহরের প্রাণস্পন্দন! মুছে গেল আমাদের কৈশোর-যৌবনের অগণ্য স্মৃতি এবং অপরূপ এক নৈসর্গিক ছবি! মন হাহাকার করা সে এক ভিন্ন কাহিনি।

যাই হোক, প্রবল বৃষ্টিতে ও বর্ষায় নদীর জল বেড়ে গেলেই সংলগ্ন খাল, বিল, পুকুর সব ডুবে একাকার। তখন আলাদা করে আর খাল, বিল, ডোবা চেনা যেত না। সর্বত্র জল থইথই। মনে হতো নদীটাই বুঝি চলে এসেছে বাড়ির পাশে। আমাদের বাড়ির গা ঘেঁষা খালটি প্লাবিত হয়ে বিশাল জলাশয়ের আকার নিত। তার বুকে গুচ্ছ গুচ্ছ কচুরিপানার বয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে মনে হতো ছোটো বড়ো নানা আকারের সবুজ ভেলা যেন ছুটে চলেছে আপনবেগে। বর্ষার তোড়ে খালের জল উপচে প্রতি বছর বাড়ির উঠোনকে ছাপিয়ে যেত, বাড়ি ঢোকার রাস্তা ডুবুডুবু, এমনকী এই জল কখনো কখনো ঘরের মধ্যেও ঢুকে যেত। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখতাম হাওয়াই চটি খাটের নিচে নেই, দূরে জলে ভাসছে, আর জলের কিছু পোকা ও ছোট্ট ছোট্ট মাছের পোনা নির্বিবাদে মেঝেতে কিলবিল করছে। ভাবতাম কী দুঃসাহসই না এদের! কীভাবে ঘরের মেঝে জবরদখল করে মনের আনন্দে এরা জলে ভেসে বেড়াচ্ছে!

এই সময়ে আরেকটা জিনিস খুব মন কেড়ে নিত। তা হলো বর্ষার আগমনের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যেত ব্যাঙেদের সমস্বরে কলতান। দিনেরবেলায় খুব একটা বোঝা যেত না, কিন্তু বিকেল হতে না হতেই ব্যাঙেদের গলা ছেড়ে গান শুরু হয়ে যেত। জানান দিত বর্ষার আগমন বার্তা। দেখা যেত হলুদ, হালকা সবুজ, ধূসর প্রভৃতি নানা রঙের লম্বা, চ্যাপ্টা, ছোটো, মাঝারি বিভিন্ন আকারের ব্যাঙ খালবিলের পারজুড়ে যেন মেহফিল বসিয়েছে; ওদের খুশির সীমা নেই, হুটোপুটি করছে, দল বেঁধে বা একটি একটি করে লাফিয়ে জলে ঝাঁপ দিচ্ছে, কিছুক্ষণ জলকেলি করে আবার উঠে আসছে পারে। সে এক মজার দৃশ্য! যদি ওই সময়ে একটা ঢিল ছোঁড়া যেত ওখানে তবে পড়িমরি করে সবক'টি ব্যাঙ প্রায় একসঙ্গে জলে ঝাঁপ মারত। ওগুলোর কোনো কোনোটির আকার দেখলে চমকে যেতে হতো! এভাবেই একটা নির্দিষ্ট ছন্দে সুরে ওদের সমবেত সংগীত চলত রাত পর্যন্ত। ওই শব্দে রাতে বিছানায় শুয়ে গভীর ঘুমে ঢলে না পড়া পর্যন্ত কেমন যেন একটা আচ্ছন্নতার সুর অবিরাম কানে বেজে যেত।

বর্ষা-দিনের সন্ধ্যায় পড়ার সময় যখন মুষলধারায় বৃষ্টি নামত, তখন পড়ার কথা ভুলে অনাস্বাদিত আনন্দে মন চলে যেত এক অন্য জগতে। তেমনি ছেলেবেলার আরেকটি আনন্দ-মুহূর্তের স্মৃতিও মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে যায় তা হলো, রাতে শুতে যাওয়ার পর যখন টিনের চালে ঝমঝম করে বৃষ্টি ঝরে পড়ত। রাতের নৈঃশব্দ্যকে খানখান করে একদিকে বিদ্যুৎগর্জন, তার সাথে টিনের চালে বৃষ্টি পড়ার বিচিত্র ছন্দ, সবকিছু মিলে মেঘ-মল্লারে এক অপূর্ব সুরধ্বনির আবহে যেন নিদ্রাদেবীকে বরণ করত। তখন মনে হতো এই বর্ষণমুখর রজনীর যেন অবসান না হয়। আমার ব্যাকুল হৃদয় তখন যেন বৃষ্টির উদ্দেশ্যে বলতে চাইত —

"তুমি যেয়ো না, তুমি যেয়ো না,
আমার বাদলের গান হয়নি সারা
"...

এই বর্ষাকালেই যেদিন রাতের দিকে বৃষ্টি থেমে যেত, হঠাৎ কখনো ভেসে আসত অপূর্ব বাঁশির সুর। সারাদিন সাইকেলে গ্রামগঞ্জ ঘুরে নানা মনিহারি জিনিসপত্র ফেরির পর রাতে বাড়ি ফেরার পথে আমাদের বাড়ি সংলগ্ন খালের ওপরে কাঠের সাঁকোয় দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণের জন্য বাঁশি বাজাতেন রবিয়ালদা। তখন আমার কিছুটা বড়োবেলা এবং এই বাঁশিবাদক যে সাঁকোর ওপারের বাসিন্দা রবিয়াল হোসেন তা জানা ছিল। বাড়ি ফেরার পথে এই সময় যেন তাঁর শিল্পীসত্তা জেগে উঠত। বাঁশি তাঁর ব্যাগেই থাকত। তখন বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে তিনি বোধহয় সারাদিনের ক্লান্তি ঘুচিয়ে প্রাণের আরাম ও মনের আনন্দ অনুভব করতেন। তিনি ওই সময়ে 'ময়নামতি শিল্পী সমাজ' নামের এক লোকশিল্পী সংস্থার হয়ে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে, এমনকী বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেখানেও পাড়ি দিয়েছিলেন। তাঁর কাছেই শোনা, ঢাকায় তাঁদের অনুষ্ঠানে এসেছিলেন স্বয়ং শেখ মুজিব। পরবর্তীকালে গণনাট্য সংঘের শিল্পী হিসেবে তাঁর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য পেয়েছি। যাই হোক, নিঝুম রাতে রবিয়ালদার বাঁশির সুর যেন তখন এক মোহময়ী আবেশ সৃষ্টি করে আমাকে নিয়ে যেত নিবিড় ঘুমের দেশে।

বর্ষার এই বানভাসি অবস্থায় খুব মজা লাগত বাড়ি লাগোয়া খালের জলে নেমে হুল্লোড় করতে। এই জল যে কত নোংরা, দূষিত এসব তখন ভাবার অবকাশ থাকত না। বাড়ির বড়োদের চোখে পড়ে তীব্র বকুনি না খাওয়া পর্যন্ত জল থেকে ওঠার নামও করতাম না। তবে বাড়ি ঢুকে স্নান করাটা বাধ্যতামূলক ছিল।

আমাদের যখন এই অবস্থা তখন নদী-তীরবর্তী চর অঞ্চলগুলো তো একেবারে জলের তলায়। সেইসব চরের মানুষদের দুর্ভোগের সীমা থাকত না। এরা সবাই মুসলমান সম্প্রদায়ের, সরাসরি নৌকো করেই চলে আসতেন শহরে বিকিকিনির জন্য। বর্ষায় তাঁদের ঘরবাড়ি জলমগ্ন হওয়ায় খেতের ধান, পাট ও অন্যান্য ফসল এবং হাঁস-মুরগি-গোরু-ছাগল ইত্যাদি রাখার জায়গা থাকত না। তাই তাঁরা সেসব নৌকো করেই নিয়ে আসতেন শহরের হাটে বিক্রির জন্য। জীবনধারণের প্রয়োজনে তখন এসব খুবই সস্তায় বিক্রি করতে বাধ্য হতেন। সেই টাকায় তাঁরা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে নিয়ে যেতেন পরিবারের দিন গুজরানের জন্য। কিছু এলাকায় এমনই দুর্বিষহ অবস্থা হতো যে বাড়িঘরে জল ঢুকে যাওয়ায় উনোন ধরানোর জায়গাটুকুও থাকত না। তখন তাঁরা শুকনো মুড়ি চিড়ে বা কাঁঠাল খেয়ে দিন কাটাতেন। আমাদের বাড়িতে আম, কাঁঠাল, লিচু, কলা, কালোজাম, জলপাই, খেঁজুর, নারকেল, বেল, আতা ও নোনা ফল, কামরাঙা, আঁশ ফল, ডেউয়া, চালতা, বাতাবি লেবু ইত্যাদি নানা ফলমূলের প্রচুর গাছ ছিল। বিশাল বিশাল আকারের কাঁঠাল এত বেশি পরিমাণে হতো যে তার এক শতাংশও খেয়ে শেষ করা যেত না। তখন দেখতাম বাড়ির দুধওয়ালা ও তাঁদের পরশি কেউ কেউ অথবা জলপ্লাবিত চর অঞ্চল থেকে আসা মানুষেরা আমাদের গাছের কাঁঠাল নৌকা বোঝাই করে নিয়ে যেতেন। যখন শুনতাম জলপ্লাবিত এইসময়কালে শুধু কাঁঠাল খেয়েই তাদের দিনযাপন হবে, খুব অবাক হতাম, কষ্টও হতো। প্রতিবছর এই ছিল তাঁদের জীবনচিত্র।

নৌকো যে যায় ভেসে

চরের সেই ছাপোষা মানুষদের নৌকাগুলো বাঁধা থাকত আমাদের বাড়ির ধার ঘেঁষে খালের জলে। মনে হতো যেন কোনো খেয়াঘাট। সেও এক মনোরম দৃশ্য! এই মানুষগুলো খুবই বিশ্বাস করে তাদের নৌকার লগি, বৈঠা সব রাখতেন আমাদের বাড়ির ভেতরে। আর এই মওকাতেই থাকতাম আমরা। ওরা লগি, বৈঠা সব বেঁধেছেদে বাজারে চলে যাবার পর শুরু হতো আমাদের নৌকা বাওয়ার অভিযান। পাশের বাড়ির অমল ছিল আমার আবাল্য ছায়াসঙ্গী। কাজেই অবধারিত ভাবে সে ছিল এই অভিযানের মূল কাণ্ডারি। সু্যোগ বুঝে ছোট্ট মতো নৌকা বেছে নিয়ে দড়ি খুলে খালের জলে ভাসাতাম। নৌকো চালানোতে যে বিরাট দক্ষতার প্রয়োজন হয় তখন সেসব কথা আর কে ভাবে! নৌকার দড়ি খুলে তো নেমে পড়া গেল জলে, তারপর এক নাজেহাল অবস্থা! আমরা নৌকা যেদিকে নিয়ে যেতে চাই নৌকা চলে তার বিপরীত দিকে। তবু্ও আমাদের কসরত চলতেই থাকে। তখন আমাদের যেন একটা নেশায় পেয়ে বসেছে। এভাবেই এঁকেবেঁকে গোত্তা খেতে খেতে এগিয়ে চলে আমাদের নৌকা। এরপর আবার সেই কসরত করেই ফিরে আসা। তবুও আমাদের উৎসাহের শেষ নেই। প্রায় রোজই চলে আমাদের এই অভিযান। একবারতো এভাবে নৌকা নিয়ে গিয়ে পড়েছিলাম মহা বিপদে। অমলের হাতে লগি,আমার হাতে বৈঠা, এভাবে নৌকো নিয়ে অনেকটা দূর চলে গেছি। চলতে চলতে পড়ে গেছি একেবারে প্রবল স্রোতের মাঝখানে। স্রোতের টানে নৌকো একবার এদিকে টাল খায় তো আরেকবার ওদিকে! সে এক বিপন্ন অবস্থা! অমল যদিওবা সাঁতার জানে, আমি কিছুই না। আর সেখানে জলের গভীরতা ছিল অনেক, লগি থই পায়না। শেষ পর্যন্ত অমলের বুদ্ধি, ধৈর্য ও শারীরিক দক্ষতায় কোনোমতে সেদিন স্রোতের কেবল থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলাম। আমরা যখন কোনোমতে নৌকা সামলে নিয়ে ফিরছি, তখন বাজার ফেরত নৌকার মালিক ফিরে এসে তাঁর নৌকাটি না দেখে হাঁকডাক শুরু করে দিয়েছেন, দূর থেকে তা আমাদের কানেও পৌঁছাচ্ছে। তখন আমাদের একেবারে দিশাহীন অবস্থা! শেষ পর্যন্ত অমলের বুদ্ধিতে আমাদের বাড়ির পিছনে অন্য বাড়ির গায়ে নৌকোটা লাগিয়ে তাতে লগি, বৈঠা রেখে আমরা হাওয়া। সেদিন টের পেয়েছিলাম বিপদ কাকে বলে! তার জন্য অবশ্য আমাদের নৌকা-অভিযান কিন্তু বন্ধ হয়নি।

মন হারাবার আজি বেলা

এই বর্ষাদিনেই গ্রামের মানুষদের কাছ থেকে হঠাৎ করেই অবিশ্বাস্য কম দামে মিলে যেত ডিম, মুরগি অথবা কচিপাঁঠা। তখন আমাদের ছেলেছোকরাদের এক-দু' টাকা করে চাঁদা তুলে পিকনিক হতো আমাদেরই কারও বাড়ির উঁচু বারান্দায় অথবা সংলগ্ন পাঠশালায়। এই বর্ষার পিকনিকেও অন্যতম উদ্যোক্তা ছিল অমল।

এই বর্ষাকালে বাড়ির গাছের আম গামলায় নিয়ে কাসুন্দি, কাঁচালঙ্কা, লেবুপাতা দিয়ে মেখে খাওয়ার মজা এবং নিঃশব্দে লিচু গাছে উঠে মনের সুখে প্রায় পেট ভরে লিচু খাওয়ার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা ভোলার নয়।

আজও মনের আঙিনায় আনাগোনা করে এক বর্ষামুখর বিকেলে অমলের বদমেজাজি জেঠিমাকে এড়িয়ে তাঁর গাছের বাতাবি লেবু পেড়ে কাঁচালঙ্কা-নুন দিয়ে খাবার স্মৃতি। এমন এক বৃষ্টিভেজা দিনেই পাশের পাড়ার বন্ধুদের ফুটবল খেলায় হারিয়ে দিয়ে চার ইঞ্চি কাপ মাথায় নিয়ে প্রবল বৃষ্টির মধ্যে 'হিপ হিপ হুররে, হিপ হিপ হুররে' বলে চিৎকার করতে করতে রাস্তায় মিছিল করে ফিরেছিলাম, তখন যেন বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ মনের মধ্যে আন্দোলিত হচ্ছিল!

আর এই বর্ষার সময়ে আমায় একটা নেশায় পেয়ে বসত, তা হলো বরশি দিয়ে মাছ ধরা। বর্ষার প্লাবনের পর যখন জলে টান ধরত তখনই মাছেদের প্রাদুর্ভাব হতো বেশি। আমাদের বাড়ির চারপাশে বাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়ে জল ঢুকে নিচু জায়গাগুলোতে অনেকদিন জমা থাকত। সেখানে পুঁটি, খলসে, চেলা, ট্যাংরা, কই, সিং, মাগুর ইত্যাদি নানারকমের মাছ কিলবিল করত। বর্ষাশেষে যখন রোদ উঠত তখন বেশি বেশি করে এসব মাছ দেখা যেত। মোড়া বা ছোটো টুল নিয়ে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাছ ধরতাম। ভরা বর্ষায় বাড়ি সংলগ্ন জলমগ্ন খালের মাঝখানে মাঝিরা নৌকার সামনে বিশাল বিশাল বাঁশ পুঁতে জাল বেঁধে রাখতেন। এগুলোকে বলা হতো খড়া। বাঁশে বাঁধা তিনকোনা জাল স্রোতের উলটোদিকে জলে ডোবানো থাকত কিছুক্ষণ। তারপর তোলা হতো, স্রোতের টানে মাছ এসে ধরা পড়ত জালে। সেও এক দেখার মতোই দৃশ্য, যা ছেলেবেলায় খুব আকর্ষণ করত। দু-তিন টাকা দিয়ে সেই মাঝিদের কাছ থেকে ছোটো গামলা ভরতি জ্যান্ত মাছ কেনার আনন্দ-স্মৃতি আজও অটুট।

মাতিয়া যখন উঠেছে পরাণ

বর্ষায় স্কুলের দিনগুলোও ছিল খুবই আনন্দের। ইংরেজি 'এল' আকৃতির লম্বা স্কুলবাড়ি। সামনে স্কুলবাড়ির সমান লম্বা মাঠ। আমরা যখন নিচু ক্লাসে তখন ছিল টিনের চাল, দরমার বেড়া, মাটির ভিটে। স্কুলের অফিস, হেডমাস্টার মশাইয়ের রুম, শিক্ষকদের বসার জায়গা ছিল পাকাবাড়িতে। পরে অবশ্য পুরোনো বাড়ি ভেঙে পাকা বাড়ি হয়েছে। সে যাই হোক, বৃষ্টি হলেই স্কুলের সামনের মাঠ জলে ডুবে যেত। সেই জল মাড়িয়ে স্কুলে ঢোকার সময় কেউ না কেউ সেই জলে আছাড় খেতই। দেখে হাসির রোল উঠত আমাদের। একই অবস্থা হতো মাটির বারান্দা ডিঙিয়ে ক্লাসরুমে ঢোকার সময়। তখন স্কুল ইউনিফর্মে জলকাদা লেপটে একেবারে বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। ছেলেরা যদিওবা এই বিপত্তি কোনোমতে সামলে নিতে পারত, মেয়েরা লজ্জা-সঙ্কোচে একেবারে মিইয়ে যেত। অবশ্য এই অবস্থা যাদের হতো, তাদের তাড়াতাড়ি ছুটি দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। মাস্টারমশাইরাও অনেক সময় একই দুর্ভোগের কবলে পড়তেন। এমন বাদল-ঝরা দিনে স্বাভাবিকভাবেই পড়ায় মন বসতো না, মন চাইত গল্পগুজব, মজা করে কাটিয়ে দিতে। কাছের বন্ধুদের কেউ যদি সেদিন না আসত তবে খুবই মনখারাপ হয়ে যেত। আমাদের জানাই থাকত এমন ঝরঝর ভরা বাদরে পুরো স্কুল কিছুতেই হবে না। দুই পিরিয়ড বা চার পিরিয়ডের পর ছুটি অবধারিত। তাই স্কুলে ঢোকা থেকেই মনটা খুশিতে চঞ্চল হয়ে থাকত। অনেক মাস্টারমশাইও আসতে পারতেন না। তাঁদের ফাঁকা পিরিয়ডে তখন আমাদের অবাধ স্বাধীনতা, গুলতানির যেন বন্যা বয়ে যেত। অবশেষে বেজে উঠত দু'বার ঘণ্টার ধ্বনি, তার মানেই আমাদের ঈপ্সিত ছুটির বার্তা, আহা, কী যে আনন্দ হতো তখন! এই আনন্দে অনেকেই বইখাতা কাছের বন্ধুর কাছে জমা রেখে ঝাঁপিয়ে পড়ত স্কুলমাঠের জমা জলে। আনন্দ উদ্যাপনের এর চেয়ে বুঝি ভালো পন্থা আর কিছুই ছিল না তখন!

হৃদয়ে আজ ঢেউ দিয়েছে

তখন স্কুলের উঁচু ক্লাসে। বর্ষার আনন্দ-অনুভূতিতে কোনো ভাঁটা নেই, নেই কোনো খামতি। বরং তখন এই অনুভূতির সঙ্গে একটা বাড়তি মাত্রা সংযোজিত হয়েছে, এক সহপাঠিনীর প্রতি কিঞ্চিৎ আকর্ষণবোধ তৈরি হয়েছে। আস্তে আস্তে আকর্ষণের মধ্য দিয়ে একরকমের ভালোলাগা, সেই কিশোরবেলায় সেটা ঠিক প্রেম বলা যাবে না, ইংরেজিতে অনেকটা infatuation-এর মতো। ক্লাসে সবার মধ্যে থেকেও মনপাখিটা খাঁচা ছেড়ে মাঝে মাঝেই উড়াল দিত ওর দিকে। অনেকটা যেন রবিঠাকুরের ভাষায় 'বহু জনতার মাঝে অপূর্ব একা'। চাতক পাখির মতো আমার দৃষ্টি থাকত দুই বেণি দুলিয়ে তার আসার অপেক্ষায়। বিশেষ করে এমন বাদল-দিনে যদি সে না আসত তবে আমার সেই দিনটাই হতো মাটি। রবীন্দ্রনাথের বর্ষার সেই গানের কথাগুলিই তখন যেন মনের গভীরে অনুরণিত হতো — "আজ কিছুতেই যায় না মনের ভার,/ দিনের আকাশ মেঘে অন্ধকার — হায় রে"...

মনে পড়ে ঠিক ওই সময়েই স্কুলের লাইব্রেরি থেকে নেওয়া বঙ্কিমচন্দ্রের বিখ্যাত উপন্যাস 'রাধারাণী' পড়ার সুযোগ হয়েছিল। এটা ছিল নিতান্তই আকস্মিক ও কাকতালীয়। এটা পড়ে মনের মধ্যে বাসা বাঁধা সেই 'ভালোলাগার' অনুভূতিটা যেন আরও সজীব হয়ে উঠেছিল। সেই উপন্যাসের মধ্যেও ছিল আঁধার রাতের বর্ষার অনবদ্য বর্ণনা —

"অন্ধকার — পথ কর্দ্দমময়, পিচ্ছিল — কিছুই দেখা যায় না। তাহাতে মুষলধারে শ্রাবণের ধারা বর্ষিতে ছিল। মাতার অন্নাভাব মনে করিয়া তদপেক্ষাও রাধারাণীর চক্ষুঃবারি বর্ষণ করিতেছিল। রাধারাণী কাঁদিতে কাঁদিতে আছাড় খাইতেছিল — কাঁদিতে কাঁদিতে উঠিতেছিল। আবার কাঁদিতে কাঁদিতে আছাড় খাইতেছিল। দুইগণ্ড বিলম্বী ঘনকৃষ্ণ অলকাবলী বহিয়া, কবরী বহিয়া, বৃষ্টির জল পড়িয়া ভাসিয়া যাইতেছিল। তথাপি রাধারাণী সেই এক পয়সার বনফুলের মালা বুকে করিয়া রাখিয়াছিল — ফেলে নাই।"

প্রাচীনকাল থেকেই বর্ষা সাহিত্যের ভুবনে অন্যতম স্থান দখল করে আছে। যুগে যুগে লেখক-কবি-পদকর্তারা বর্ষাকে প্রেম-বিরহের ঋতু হিসেবে চিত্রিত করেছেন। এর অন্যতম নিদর্শন মহাকবি কালিদাসের অনন্য সৃষ্টি 'মেঘদূত'। সেখানে রয়েছে সেই বিখ্যাত পঙ্‌ক্তি —

"তস্মিন্নদ্রৌ কতিচিদবলাবিপ্রযুক্তঃ স কামী
নীত্বা মাসান্ কনকবলয়ভ্রংশরিক্তপ্রকোষ্ঠঃ।
আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে মেঘমাশ্লিষ্টসানুং
বপ্রক্রীড়াপরিণতগজপ্রেক্ষণীয়ং দদর্শ
"...

এখানে কালিদাস বলছেন, আষাঢ়ের প্রথম দিবসেই মেঘের ঘনঘটায় যে আবহ সৃষ্টি হয়েছে, তাতে যক্ষের বিরহকাতর মন চঞ্চল হয়ে উঠেছে তার দূরবর্তী প্রিয়ার কাছে যাবার জন্য। কর্তব্যে অবহেলার জন্য এক বছরের জন্য নির্বাসিত যক্ষ তাই তার বন্ধু মেঘকে অনুরোধ করছে তার বার্তা প্রিয়ার কাছে পৌঁছে দিতে। এখানে কবির কল্পনায় একখণ্ড মেঘ হয়ে উঠেছে বিরহীর বার্তাবাহক প্রাণবন্ত - জীবন্ত দূত।

'মেঘদূত' ছাড়াও বৈষ্ণব পদাবলিতেও বর্ষার সঙ্গে বিরহের একটি নিবিড় সম্পর্কস্থাপন করেছেন পদকর্তারা। পদাবলি সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ রচয়িতা চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস থেকে বিহারীলাল প্রমুখের কবিতায় ও গানে বর্ষা ও বিরহ একাকার হয়ে গেছে।

যাই হোক তখন বর্ষার সাথে আমার মনও যেন নানাভাবে জুড়ে গিয়েছিল।

স্কুলবেলার আরেকটি স্মৃতিও উজ্জ্বল হয়ে আছে। তখনও বর্ষার আগমন ঘটেনি, কিন্তু রবীন্দ্রজয়ন্তী উদ্যাপনবেলায় কালবৈশাখী ঝড় ও প্রবল বৃষ্টি যেন অচ্ছেদ্য ভাবে জড়িয়ে ছিল। স্কুলের অন্যতম বার্ষিক অনুষ্ঠান ছিল চারদিন ধরে চলা রবীন্দ্রজয়ন্তী। প্রথম দিন রবীন্দ্রনাথ নিয়ে শিক্ষক ও এলাকার বিশিষ্টদের আলোচনা, ছাত্রছাত্রীদের গান, আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশনা। দ্বিতীয় দিন এসবের সাথে যুক্ত হতো রবীন্দ্রনাথের হাস্যকৌতুক অভিনয়। তৃতীয় দিন গান, আবৃত্তি, নাচের সঙ্গে মেয়েদের অভিনীত নাটক ও শেষের দিন অন্যান্য কর্মসূচির সাথে ছেলেদের নাটক। স্কুলের লম্বা বাড়ির ক্লাসরুমের মাঝের অস্থায়ী দরমার পার্টিশনগুলো খুলে দিয়ে প্রেক্ষাগৃহ তৈরি হতো। স্কুলবাড়ির একেবারে শেষপ্রান্তে একটা ক্লাসরুমে তৈরি করা ছিল স্থায়ী মঞ্চ। সেখানেই ব্যাকড্রপ, সাইড উইংস ও সামনে ড্রপসিন লাগিয়ে স্টেজ তৈরি হতো। এই মঞ্চ সাজানোর ছলে বন্ধুদের সঙ্গে রাত জাগা, লুকিয়ে সিগারেট টানার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা ও হাসি মশকরায় দুরন্ত প্রহর যাপনের স্মৃতি কখনো বিস্মৃত হবার নয়। স্টেজের সামনে একপাশে রবীন্দ্রনাথের মালা দেওয়া বড়ো প্রতিকৃতি রেখে দু'পাশে ফুলদানিতে রাখা হতো রক্তিম কৃষ্ণচূড়ার গুচ্ছ এবং ধূপদানি। ভাড়া করা মাইক ও বিদ্যুৎ না থাকায় জেনারেটরের আলোয় হতো অনুষ্ঠান। বছরের পর বছর এই একই রকমের আয়োজনে কোনো রকমফের হতো না। সাধারণত উঁচু ক্লাসের কিছু সপ্রতিভ ছাত্রের উপর থাকত আয়োজনের ভার। আর নাটকে যারা অংশ নিত তাদের বিশেষ অনুমতি থাকত টিফিন পিরিয়ডের পর প্রতিদিন রিহার্সালে অংশ নেবার। কিন্তু ট্র্যাজেডি হচ্ছে এটাই, প্রায় প্রতি বছর ঝড়বৃষ্টিতে কোনো না কোনো দিন অনুষ্ঠান পণ্ড হতোই। এমনও হয়েছে এক-দু'দিনের পর আর অনুষ্ঠান করাই সম্ভব হয়নি। এখনো স্মরণে আছে একবার মঞ্চে আমাদের 'বশীকরণ' নাটক চলছে। এমন সময় ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। টিনের চালে মুষলধারায় বৃষ্টির শব্দ মাইকের শব্দকেও ছাপিয়ে গেল। অগত্যা আর কী করা! বন্ধ হয়ে গেল নাটক, ভেস্তে গেল অনুষ্ঠান। এভাবে বিপুল পরিশ্রমে দিনের পর দিন প্রস্তুতি নেবার পর অনুষ্ঠান বানচাল হবার যে কী মনোবেদনা তা তখন উপলব্ধি করেছি। তখন বৃষ্টি যেন আমাদের কাছে উদয় হতো খলনায়কের ভূমিকায়।

দুখের বেশে

একেবারে শৈশবেই বর্ষা প্রথম এসেছিল অসীম দুঃখের বেশে। ছেলেবেলায় আমাদের প্রধানতম অবলম্বন, সেই সময়ে আমাদের জীবনজুড়ে যাঁর ছিল উজ্জ্বল উপস্থিতি, প্রিয়তম 'দাদু' এক বর্ষাদিনেই চিরতরে চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে। সেই প্রথম উপলব্ধি করলাম প্রিয়জনকে হারানোর ভয়ংকর মর্মবেদনা! আমাদের আদরের তিন বছরের ছোট্ট ভাই 'ঝুনঝুনু'ও আমাদের হৃদয়কে চুরমার করে জীবন থেকে ছুটি নিয়ে চলে গিয়েছিল চিরতরে, সেটাও ছিল ঘনবর্ষায়। এভাবেই বর্ষার দিনে আরও এক ভাই 'রূপক', আমাদের 'বড়োকাকু', 'পিসিমণি' সবাইকে হারানোর মর্মান্তিক বেদনা এসে আঘাত দিয়ে গেছে। তাই বর্ষার সেই দিনগুলি হয়ে উঠেছিল দুঃসহ! এই বড়োবেলায় এসে আমার প্রিয়তম বন্ধু, প্রাণের সঙ্গী অমলের আকস্মিকভাবে না ফেরার দেশে চলে যাবার মর্মান্তিক সংবাদও এসেছিল এক বর্ষাদিনেই। তাই এখন বাদল-দিনে এসব ভেবে 'স্মৃতিবেদনার মালা একেলা গাঁথি'।

আমার যে গান

আমার কাছে বর্ষা আর রবীন্দ্রনাথের গান যেন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। কবির বর্ষার অনেক গানের বাণীতে যে চিত্রকল্প রচিত হয়েছে, তা আমার শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিপটে একাকার হয়ে আছে। যেমন 'বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল'...। ছেলেবেলায় দেখা আমাদের বাড়ির একপ্রান্তে বিশাল গাছের বৃষ্টিধোয়া সবুজ পাতার ফাঁকে গুচ্ছ গুচ্ছ শ্বেতশুভ্র কদম ফুলের সমারোহ, চারপাশে ছড়িয়ে দিত মনোরম স্নিগ্ধতার আবেশ। কোন ছোটোবেলায় শোনা পঙ্কজ মল্লিকের কণ্ঠে 'বর্ষণমন্দ্রিত অন্ধকারে'... এবং 'আমার প্রিয়ার ছায়া আকাশে আজ ভাসে'... বর্ষারই গান। বিশ্বকবির অনন্য সৃষ্টির সাথে গায়কের অনবদ্য উপস্থাপনা, যা আজও যেন প্রাণে বাজে। তেমনি শুনেছিলাম দেবব্রত বিশ্বাসের গাওয়া 'আবার এসেছে আষাঢ়'... এবং 'আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার'... আমার মনে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ বুঝি দেবব্রত'র জন্যই বর্ষার এই গানদু'টি রচনা করেছিলেন। আর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে 'মন মোর মেঘের সঙ্গী'... শুনে সেই ছেলেবেলাতেই মন উড়ে যেত হংসবলাকার পাখায় ভর করে বহু দূরে। আবার তাঁর কণ্ঠেই যখন শুনেছি 'আমার দিন ফুরালো ব্যাকুল বাদল সাঁঝে'... তখন কেন জানিনা এক অজানা বেদনার আবেশ মনে ছায়া ফেলেছে। এভাবেই রবীন্দ্রসংগীতের প্রতি প্রবল আসক্তিতে শোনা হয়েছিল চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়ের গাওয়া 'যেতে দাও যেতে দাও গেল যারা'... এবং সাগর সেনের কণ্ঠে 'ওই মালতিলতা দোলে'... এই দুই শিল্পীর অনবদ্য কণ্ঠমাধুর্যে বর্ষার গানদু'টির রেশ সেই ছেলেবেলাতেই মনের মধ্যে অন্যান্য গানের সঙ্গে স্থায়ী আসন করে নিয়েছিল। একদিন হঠাৎ করেই কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাওয়া 'শাঙন গগনে ঘোর ঘনঘটা, নিশীথ যামিনীরে'... কানে বেজেছিল। 'ভানু সিংহের পদাবলি'র অন্তর্গত এই গানটিতে শ্রাবণের আকাশে মেঘমন্দ্রিত বিদ্যুৎচমকিত গাঢ় অন্ধকারাচ্ছন্ন দুর্যোগপূর্ণ রাতের ঘনঘোর বর্ষার ছবি যেমন চিত্রিত হয়েছে, তেমনি রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের অনুষঙ্গ এসেছে অপরূপ আঙ্গিকে। কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সুললিত কণ্ঠে, অনুপম গায়কিতে যেভাবে গানের ভাব এবং চিত্রকল্প তুলে ধরেছেন, তা হৃদয়ের অন্তঃস্থলকে যেন স্পর্শ করেছিল। একইসঙ্গে আমার হৃদয়কে যেন শ্রাবণধারায় সিক্ত করেছিল। এই গানের টানেই শুনেছিলাম সুচিত্রা মিত্রের গাওয়া 'মেঘের পরে মেঘ জমেছে'... এবং 'কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি'..., এই গানদু'টিও আমার কিশোরমনকে মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন করেছিল। কৈশোর-যৌবনের সন্ধিক্ষণেই শুনেছিলাম শান্তিদেব ঘোষের কণ্ঠে 'আষাঢ়, কোথা হতে আজ পেলি ছাড়া' এবং সুবিনয় রায়ের গাওয়া 'পুব হাওয়াতে দেয় দোলা'। এই গানদু'টিও আমার মনে বর্ষার এক অপরূপ আবহ রচনা করেছিল। সেই কবে রেডিয়ো অথবা রেকর্ড প্লেয়ারে শোনা এই গানগুলোর স্মৃতি আজও অনুরণিত হয় মনের গভীরে। শৈশব পেরিয়ে এসে একদিন হঠাৎ করেই শুনেছিলাম সন্‌জিদা খাতুনের কণ্ঠে 'আজি শ্রাবণঘনগহন মোহে'..., আহা! সেই মুগ্ধতার স্মৃতি আজও অমলিন।

ছেলেবেলায় বন্ধুরা মিলে একটি গানের স্কুল গড়ে সেখানে আমাদের গান শেখার তোড়জোড় ছিল কিছুদিন। যদিও সেই প্রয়াস অত্যন্ত সফলতার সঙ্গেই ব্যর্থ হয়েছিল। তবুও সেখানে প্রসাদদা (প্রসাদ চক্রবর্তী, বর্তমানে প্রয়াত) কিছুদিন শিখিয়েছিলেন 'আজি বরিষনমুখরিত শ্রাবণরাতি',... সেও বর্ষারই গান। সেখানে প্রসাদদার কণ্ঠেই 'ছায়া ঘনাইছে বনে বনে'... প্রথমদিন শুনে গানের কথা-সুরের সঙ্গে বর্ষার যে অপূর্ব দৃশ্যপট মনের মধ্যে রেখাপাত করেছিল, তা আজও ভুলতে পারিনি।

এক বাদল-দিনেই ফেলে আসা বর্ষা-দিনের এসব স্মৃতি কেন জানি না হঠাৎ করেই মনে দোলা দিয়ে গেল, অনেককিছু হারানোর বেদনায় আর্দ্র হলো মন, তখনই অনুভব করলাম মনের গহনে রবিঠাকুরের এক বেদনা-সিক্ত বর্ষার গানই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে —

"আমার যেদিন ভেসে গেছে চোখের জলে
তারি ছায়া পড়েছে শ্রাবণগগনতলে
"...


[বর্ষার অনুসঙ্গে 'সৃষ্টির একুশ শতক' পত্রিকার আগস্ট, ২০২৫ সংখ্যায় প্রকাশিত নিবন্ধের আংশিক পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত রূপ এখানে তুলে ধরা হলো।]

পরিচিতি: সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক। নিবাস: শিবপুর, হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ।