গল্প

সোনালি ধানের হাসি



পদ্মজা ঘোষ


মেয়েটার নাম হাসি দত্ত। কিন্তু নামের সাথে মিল একটুও নেই। বরং ওর নাম কান্না দিলেই মিলত ভালো। কথায় কথায় কাঁদে। না, তা বলে কান্না কিংবা কাঁদুনি, এরকম নাম রাখলে সৃষ্টিকর্তার অপমান হতো নিশ্চয়। আর তা ছাড়া নাম রাখার সময় তো আর বোঝার উপায় থাকে না, যে সে মোটেই হাসিখুশি হবে না। তবে ফুল পিসি বলেছিল, এখুনি এতকিছু বলার সময় আসেনি। সবে তো ছ' বছর বয়স। হয়তো বড় হলে এমন হাসিখুশি মেয়ে হবে, যে সবাই বলবে, মেয়ের নাম সার্থক। আবার মুকুলকাকু বলেছিলেন, ও হয়তো পূর্বজন্মের এমন একটা কিছু বয়ে এনেছে সঙ্গে করে, যা ওকে বার বার কাঁদায়। পল্টু, মানে ওর জ্যেঠুর ছেলে, মাধ্যমিক দেবে এবার, বলে বসল, "আরে ওর depression হয়েছে। এইজন্যই খালি কাঁদে।" শুনে সবাই হো হো করে হেসে উঠল। "এইটুকু মেয়ে, ওর আবার depression কী রে?" সেজোমামু বললেন। সেদিন বিছানায় হাসির পাশে শুয়ে সেজোমামু গান শুনছিলেন। ভাটিয়ালি গান।। হঠাৎ খেয়াল করলেন, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে হাসি। মামু বুঝলেন, মেয়েটার ভেতরে আবেগের জায়গাটা অত্যন্ত সংবেদনশীল, সুরের মায়া ওর ভেতরে এক আলোড়ন সূষ্টি করে যা ওকে কাঁদায়। মামু গান বন্ধ করে দিয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। হাসি আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়ল।

হাসি একটু একটু করে বড় হয়। স্কুলে ওর তেমন বন্ধুবান্ধব হয় না। সবাই ওকে কান্না বলে ডাকে। কিন্তু বাংলার কবিতা ম্যাম ওকে আদর করে বৃষ্টি বলে ডাকেন। ছেলেমেয়েদের বলেন, "তোমরা জান? বৃষ্টির কত গুণ? সে কিন্তু ফসল ফলায়। দেখবে, আমাদের বৃষ্টির কারণে একদিন দেশে সোনার ফসল ফলবে।" কথাটা বলেই হাসির দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করতেন, ঠোঁটের কোণায় একটু কি হাসির রেখা ফুটল? হ্যাঁ, আশ্চর্য, ফসলের কথা শুনলেই একটু খুশি খুশি মনে হয় হাসিকে। কবিতা ম্যাম যেদিন 'সোনার তরী' কবিতা পড়াচ্ছিলেন, সেদিন, হাসি সত্যিই হাসিতে ভরে উঠেছিল। কবিতা ম্যাম এর কারণ মনে মনে ভাবতে থাকে। কূল কিনারা পায় না।

মাস যায়, বছর যায়, হাসি বড় হয়। একদিন বাড়ির সামনে দিয়ে এক ফেরিওলা যাচ্ছিল। হঠাৎ হাসি বলে উঠল, "ও করিম চাচাআআ..., দাঁড়াও, আমি আসছি।" ফেরিওলা এদিক ওদিক তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করে, মেয়েটি কাকে ডাকছে। হাসি ছুটে এসে বলে, "আরে করিম চাচা, তোমাকে কবে থেকে আমি খুঁজছি, তুমি হাঁসখালি ছেড়ে এখানে এইসব জিনিস নিয়ে ঘুরছ কেন? মাঠের ধান পেকেছে? কাটা হবে কবে? ও, তুমি আমাকে খুঁজতে এসেছ বুঝি? আমাকে ঐ মাঠ থেকে নৌকো করে নিয়ে এলো তো। ঐ ধানের ক্ষেতে রক্তের নদী হলো। তোমরা দেখোনি? একটা লোক নৌকোয় আমাকে তুলে নিল। আমি ঐ রক্তের নদীতে নৌকা চড়ে এখানে এসেছি।" বলতে বলতে এলিয়ে পড়ল হাসি, ওর মা ছুটে এসে দেখে, মেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে। চারিদিকে শোরগোল পড়ে গেল, ধর ধর, হাসি জ্ঞান হারিয়েছে। ফেরিওলা অবাক হয়ে গেল। এই মেয়েটা তাকে করিম চাচা বলে ডাকল কেন, কে এই করিম চাচা? আর এই মেয়েটি এসব কী বলল? আজ আর ফেরীতে মন দিতে পারে না রাখাল। মনে পড়ল, মেয়েটা বলছিল হাঁসখালির কথা। ডায়মন্ড হারবারের দিকে যেতে যে গ্রামটি পড়ে, সেই হাঁসখালি? মেয়েটার বয়স তো দশ এগারোর বেশি না। হাঁসখালিতে একবার গেলে হয় না? কৌতূহল বাড়ল।

পরদিন রাখাল সকাল সকাল রওয়ানা হলো হাঁসখালির উদ্দেশ্যে। এত বড় গ্রাম, কোথায় কী খোঁজ করবে। এখান থেকে কোনও শিশু নিখোঁজ হয়েছে কি না, কতদিন আগে, ইত্যাদির উত্তর পেতে মন উতলা হয়ে উঠেছে। এখন অঘ্রানের মাঝামাঝি। মাঠে পাকা ধান উঁকি মারবে যেখানে, সেখানে একবার খোঁজ করতে হবে। আস্তে আস্তে গান ভেসে আসছে দূর থেকে। অদূরে গঙ্গা। ভাটিয়ালির সুরে জোয়ার তুলেছে মাঝিরা। আহা, এত মধুর, তবু কোথায় যেন একটা হাহাকার। সুরের ঢেউয়ে ভেসে কখন দু'ধার ভরে উঠেছে সোনালি ধানে, খেয়ালই করেনি রাখাল। মাঠে কাজ করছে কয়েকজন নারীপুরুষ।

রাখাল হাঁক দিল, "একটু শুনবেন?"

কর্মরত পুরুষ এবং মহিলারা একে একে তার দিকে তাকাল। রাখাল দেখল, তাদের চোখেমুখে অসম্ভব এক বিস্ময় ফুটে উঠেছে। ধীরে ধীরে তা ভয়ের আকার ধারণ করছে, দু' একজন পালানোর চেষ্টা করে টাল খেয়ে মাঠে পড়ে গেল। রাখালের কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা।

ঝটপট নিজেকে সামলে বলে ওঠে, "আরে আমি ডাকাত নই, আমাকে দেখে ভয় পাচ্ছেন কেন আপনারা? আমি রাখাল। কলকাতা থেকে আসছি। কিছু জানবার ছিল। দয়া করে আমাকে একটু সাহায্য করুন।" কথাগুলো জোরালো এবং স্পষ্টভাবে কানে যায় সেই ভয়ার্ত নারীপুরুষের কানে। একটু যেন আশ্বস্ত হয়। সাহস করে এগিয়ে আসে।

পেছন থেকে একজন বলে ওঠে, "তোমার নাম রাখাল? আমরা তো ভাবলাম করিম চাচার ভূত। তুমি হিঁদু? তাহলে অমন দাড়ি যে বড়?"

রাখাল হেসে উঠল এবার। "ও, দাড়ি রাখলে হিঁদু হয় না বুঝি? কী আর করা যাবে, আমার দাড়ি ভালো লাগে। সে কথা থাক, করিম চাচার ভূত মানে? সে কি মরে গেছে?"

তাড়াতাড়ি এক মহিলা এসে বলে, "ও মা, সে তো এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড গো। করিম চাচা ছিল এ গ্রামের এক চাষী গো। ভারি মায়ার শরীর ছিল তার। এই মাঠে যখন ধান ফলতো, করিম চাচা গানের সুরে সারা মাঠ ভরিয়ে দিত। কী যে ভালো ছিল!" বলতে বলতে চোখ মুছল আঁচলের খুটে।

অন্য এক পুরুষ কাহিনীর হাল ধরে বলে, "অদৃষ্ট গো, সবই অদৃষ্ট। কাল কেউটের কবলে পড়ল দুধের ছোট্ট মেয়েটা, সাপটাকে মারতে গিয়ে কোপ পড়ল গিয়ে শিশুটার উপর, রক্তে ভেসে গেল...," বলতে বলতে হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠে। "ঐখানেই শেষ হলো মেয়েটা। ততক্ষণে কেউটের কামড়ে সেও..." বাঁধ ভেঙে কান্না আসে।

"আর মজার কথা কি জানো, গ্রামের সব্বার মতো মেয়েটাও করিম চাচা বলে ডাকত তার আব্বুকে। তা এ কেমন করে হয় বল তো, তোমাকে দেখতে অবিকল করিম চাচার মতো। তাই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।"

শুনতে শুনতে রাখাল আনমনা হয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। অস্ফুটে মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, "হাসিনা কেমন আছে? তোমাদের হাসিনা চাচী?" বলতে বলতে এলিয়ে পড়ল ধানের গায়ে। "তাকে ব'লো, তার মেয়ে ভালো আছে। সে এখন কলকাতার যাদবপুরে দত্ত পরিবারের হাসি। আমার সঙ্গে তার মুলাকাত হয়েছে।"

দূরের ভাটিয়ালি মাঠে উপস্থিত সব পাত্রপাত্রীদের শরীরে তখন ছমছমে হিমবাহ উড়িয়ে দিয়ে গেল। রাখালকে আস্তে আস্তে তুলে, বড় রাস্তায় পৌঁছে দিল। যাবার সময় অস্ফুটে সকলেই বলল, "ভালো থেকো করিম চাচা।"

হাঁসখালি থেকে ফিরে রাখাল একদিন গেল হাসিদের বাড়িতে। বাড়ির লোককে জিগ্যেস করল, "খুকি কেমন আছে? একটু দেখতে পাব খুকিকে? সেদিন অমন অজ্ঞান হয়ে গেল..., তাই দেখতে এসেছি।"

হাসি এল। রাখাল একটি কথাই শুধু বলল, "হাঁসখালির মাঠ সোনালি ধানে ভরে উঠেছে।"

হাসির মুখ অমলিন হাসিতে ভরে গেল। "আচ্ছা, আমি আসি", এই কথার সঙ্গেই সে বিদায় নিল।

শোনা যায়, এরপর হাসির মুখে হাসি লেগেই থাকত। ফুলপিসি বললেন, "দেখলে তো, আমি বলেছিলাম না, একদিন নাম সার্থক করবে আমাদের হাসি।"

পরিচিতি: বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী, সুলেখিকা ও গবেষক।