হোটেলের লবিতে পা দেওয়া মাত্রই ফোনটা বিশ্রীভাবে বেজে ওঠে। অথচ এই সময় তার ফোনে কারো ফোন করার কথা নয়। কারণ এদেশে তাকে ফোন করার মতো কেউ নেই। ফোনটা নিয়ে দেখল ওয়াটস আপ কল। আবার সেই মনোহর বিশ্বাস। অবাক হয় অলোককান্তি। লোকটা কী জাদু জানে শহরে পা দিতে না দিতে ফোন। বিরক্ত হয় অলোকান্তি ফোনটা বেজে যেতে দেয়। চেক ইন করে ঘরে এসে ভালো ভাবে গুছিয়ে বসে। প্রচুর ধকল গেছে আজ সারাদিন।
ঘটনার সূত্রপাত একটা চিঠিকে কেন্দ্র করে। চিঠিটা যদিও বেশ কয়েকমাস আগে লেখা হয়েছে। চিঠির প্রেরক সম্পূর্ণ অপরিচিত। অলোক কান্তি মনোহর বিশ্বাস নামে কারো কথা শুনেছে বলে মনে করতে পারে না। চিঠিটা অনেক ঘুরে তার কাছে এসে পৌঁছেছে। রিডাইরেক্ট হতে হতে খামটা লাল নীল সবুজ পোস্টাল স্ট্যাম্পে বেশ একটা মনোহর রূপ ধারণ করেছে। অলোককান্তি দত্ত যার পরিচিতি এ কে ডাট নামে কিন্তু খামটার ওপরে লেখা নামটা অনিমেষকান্তি দত্তের। অবশ্য এক অর্থে উনিও এ কে ডাট। অনিমেষকান্তি অলোককান্তির গ্র্যান্ড ফাদার।বহু বছর আগে তরুণ বয়সে তিনি ভাগ্যান্বেষণে দেশ ছাড়েন। সেই থেকে তিন পুরুষ তারা প্রবাসী। একটা স্থায়ী ঠিকানা অবশ্য তাদের আছে তাই অনেক ঘুরে সেই ঠিকানাতে এসেছে চিঠিটি। তাদের পদবি যে কোনো কালে দত্ত ছিল খামটা যেন নতুন করে সেই বার্তা বয়ে এনেছে। চিঠিটা হাতে নিয়ে অনেক রকম চিন্তা করে চলেছে এ কে ডাট। প্রথমত চিঠিটা তার নয় তার ঠাকুরদার নামে লেখা, যিনি প্রায় কুড়ি বছর আগে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, সেটা খোলা ঠিক হবে! একজন মৃত মানুষকে কি কেউ চিঠি লেখে! মাঝখানে অবশ্য তার বাবা ড. অমলকান্তির নামেও চিঠিটা নামাঙ্কিত হয়ে বাবার কর্মস্থলের ঠিকানায় গেছিল। স্বর্গত বাবার দ্বিতীয় পক্ষ মিসেস ডরোথি চিঠিটা তাকে রিডাইরেক্ট করেছে। খুব ভালো করে খেয়াল করে দেখল প্রেরক মনোহর বিশ্বাসের ঠিকানা হিসেবে ভারতবর্ষের একটা ছোট শহরের উল্লেখ রয়েছে।
চিঠিটা হাতে নিয়ে তার আবছা মনে পড়ে ছোটো বেলায় গ্র্যান্ড পা'র মুখে যেন শুনেছিল ওদেশের কথা। বৃদ্ধ বয়সে তার হয়তো মনে পড়ত শৈশবের সেই দিনগুলোর কথা। বারবার তাকে বলতে শুনেছে তার এক ভাইয়ের কথা, তার কাকার একমাত্র সন্তান। অনেকক্ষণ স্মৃতি হাতড়ে মনে করতে পারল গ্র্যান্ড পা'র সেই ভাইয়ের নামটা, অশোককৃষ্ণ দত্ত। রক্তের সম্পর্ক বিচার করলে ওই অশোককৃষ্ণও তার গ্র্যান্ড পা। কিন্তু কারো মুখে তো কখনো এই মনোহর বিশ্বাসের নাম শুনেছে বলে মনে করতে পারল না। বাবার মুখে তো ও দেশের কোনো কথা কখনো শোনেনি কারণ বাবা কখনো ওদেশে যায়নি। তার জন্ম মৃত্যু সবই প্রবাসে। তার নিজের দেশ বলতে কখনই ভারতের নাম আসে না। অনিমেষকান্তি শেষবার যখন ভারতে গিয়েছিল তখন তার প্রায় ষাটের কাছাকাছি বয়স, অলোকের মনে পড়ে তার কিছুকাল পরেই তার গ্র্যান্ড পা অবসর নিয়েছিলেন আর তখনই অবসর যাপনে অলোকের সাথে তার ছেলেবেলার স্মৃতি শেয়ার করেন। কিন্তু কোনো মনোহর বিশ্বাসের নাম তো তার স্মৃতি ভাষ্যে ছিল বলে মনে পড়ে না। তাহলে এই লোকটা অনিমেষকান্তি দত্তকে চিঠি লিখল কেন! স্বল্প পরিচিত কেউ কি যার কথা হয়তো সেই সময়ে অনিমেষকান্তি দত্তের মনে পড়েনি। এই সব নানা সম্ভব অসম্ভব কথা ভাবতে ভাবতে চিঠি খানা খোলার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে অলোক।
কিন্তু আরেক সমস্যা দেখা দিল খামখানা খোলার পর। চিঠিটা হাতে লেখা এবং বাংলা ভাষায়। অলোককান্তি বাংলা পড়তে পারে না, সামান্য কিছু বলতে পারে বা শুনে বুঝতে পারে। সেটাও ওই গ্র্যান্ড পা 'র কল্যাণে। তিনি বাংলা বলতে ভালো বাসতেন আর হাতের কাছে কোনো বাঙালিকে পেলে তাকে আমন্ত্রণ করে বাড়ি নিয়ে আসতেন শুধু বাংলায় কথা বলবেন বলে। সেখান থেকেই অলোকের সাথে বাংলার একটা ধ্বনি পরিচয় হয়েছে ঠিক কিন্তু বর্ণ পরিচয় না থাকলে চিঠি পড়বেন কি করে! তখনকার মতো পড়ার চিন্তা দূরে সরিয়ে রেখে চিঠিটা রাখতে গিয়ে একটা নম্বরে চোখ আটকে গেল। ইংরেজিতে নম্বর গুলো লেখা ছিল। অনুমান করল ওটা ফোন নম্বরই হবে। অলোককান্তি খানিকটা শান্ত হল যাক অন্তত যোগাযোগের একটা সূত্র আছে। সময় সুযোগ বুঝে ফোন করে আগে জানতে হবে এই মনোহর বিশ্বাস লোকটা কে বা অনিমেষকান্তি দত্তের সঙ্গে তার যোগসূত্রই বা কী!
চিঠি পাওয়ার পর কেটে গেছে বেশ কিছুদিন। সেদিন হঠাৎ এক রেস্তোরাঁতে দেখা হয়ে গেল প্রবাসী ডাক্তার তাপস চক্রবর্তীর সাথে। আবার চিঠির কথাটা মনে পড়ল। একবার ভাবল চিঠিটা ডাক্তারকে দিয়ে পড়িয়ে নেবে কিন্তু জানেনা ওই চিঠিতে কী লেখা আছে, একজন স্বল্প পরিচিতের কাছে পরিবারের কোনো বিষয় যদি প্রকাশিত হয়ে পড়ে ভেবে বিরত হয়েছে। কিন্তু সহজে হাল ছাড়ার পাত্র নয় অলোককান্তি ডাট। ডাক্তারের কাছ থেকে কয়েক দিনের মধ্যেই বাংলা হরফ চিনতে শুরু করে দিয়েছে। ডাক্তার ও খুব উৎসাহ ভরে তাকে বাংলা শেখানোর কাজে লেগে পড়েছে। শিক্ষকের বক্তব্য আর কয়েকদিনের মধ্যে অলোককান্তি পুরো বাক্য লিখতে পড়তে পারবেন।
।। দুই ।।
বেশ কয়েক মাস পর মনোহর বিশ্বাসের মুখোমুখি হয়ে বিস্ময়াহত অলোককান্তি কথা হারিয়ে ফেলেন। ওদেশ থেকে যতবার ফোনে যোগাযোগ করেছেন মনোহর বিশ্বাসের সাথে ততবারই শুনেছেন এদেশে সশরীরে না আসলে কিছুই বলা সম্ভব নয়। বারবার একটা কথা মনোহর বলেছেন মিষ্টি বড় বিপদে পড়েছে, বড় ভেঙে পড়ছে দিনদিন। অলোককান্তি জানতে চেয়েছেন মিষ্টির পরিচয় আর তার গ্র্যান্ড পা'র সাথে তার কী সম্পর্ক। কিন্তু মনোহর বারবার বলেছেন সে রহস্য উদঘাটন তখনই সম্ভব যখন তিনি এসে নিজেকে অনিমেষকান্তি দত্তের নাতি হিসেবে প্রমাণ করতে পারবেন। মনোহর বিশ্বাসের সাথে ফোনে যতবার কথা বলেছেন তত রহস্যের জাল কাটার নেশা যেন পেয়ে বসেছে অলোককান্তিকে। মনোহর বিশ্বাস তার চিঠিতে একই কথা লিখেছিলেন। কিন্তু কী বিপদের সম্মুখীন হয়েছে মিষ্টি তা যেমন চিঠিতে লেখেন নি তেমন ফোনেও বলেননি। অবশেষে সব কাজকর্ম থেকে দু সপ্তাহের ছুটি নিয়ে কলকাতা হয়ে এলেন কৃষ্ণনগরে। কলকাতার ট্রাভেল এজেন্টের মাধ্যমে কৃষ্ণনগরে হোটেল বুক করে চলে এসেছে। অবশেষে হোটেলের ঘরে পৌঁছে মনোহরকে ফোন করলেন অলোককান্তি। উত্তর পেলেন আজকে বিশ্রাম নিন কাল দেখা হবে। একটু বিরক্ত হলেন অলোককান্তি কিন্তু মনোহরকে কিছু বললেন না। একটা বিষয় খেয়াল করলেন এরকম একটা মফস্বল শহরের পক্ষে হোটেলটা বেশ অভিজাত। রহস্য যতক্ষণ না উদঘাটন হচ্ছে ততক্ষণ অলোককান্তির মনের উত্তেজনা স্তিমিত হবে না। এই মনোহর লোকটা কেমন যেন রহস্যময়। তাকে কোনো বিপদে ফেলবে না তো! হোটেলের ঘরে আধশোয়া হয়ে অলোককান্তি ভাবতে চেষ্টা করেন কী হতে পারে। কেন তাকে এখানে ডেকে আনা হল , অনিমেষকান্তির সাথে কারো কোনো পুরনো শত্রুতার শিকার হতে হবে না তো তাকে। একবার কি লোকাল থানায় যোগাযোগ করবে। এই সব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝতে পারেনি। পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতে জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখে আকাশটা যেন কেমন মুখ ভার করে আছে। বাইরে তাকিয়ে বুঝতে পারে বেশ বেলা হয়েছে কিন্তু সূর্য অবগুণ্ঠন টেনে রাখায় তা মালুম হচ্ছে না। নিজের মোবাইলে দেখল ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ড টাইম অনুসারে সকাল দশটা বাজে। জেট ল্যাগের জন্য বোধহয় এতটা ঘুমিয়েছে। তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে স্নান সেরে যখন বাইরে বের হবার জন্য পোশাক পরে প্রস্তুত হয়েছে সেই সময়ই দরজায় নক করার শব্দ। রুম অ্যাটেন্ডেন্ট ভেবে দরজা খুলে বেশ অবাক হয় অলোককান্তি। সামনে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন ভদ্রলোকের মাথা ভরা টাক থুতনিতে সাদা দাড়ি চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। পোশাক দেখে মনে হয় যেন রহস্য উপন্যাসের কোনো সত্যান্বেষী চরিত্র। পায়ের জুতোটা কেবল একালের স্নিকার। ভদ্রলোক স্মিত হেসে পরিচয় দিলেন মনোহর বিশ্বাস। অলোককান্তি তাকে ঘরে আহ্বান করে বসতে বললেন। সোফায় মুখোমুখি বসতে বসতে মনোহর জানায় রুম সার্ভিসে কফির অর্ডার দিয়ে এসেছেন। অলোককান্তি খুব ভালো করে আপাদমস্তক মনোহর বিশ্বাস কে জরিপ করে ঠিক বুঝতে পারলেন না গতকাল রাতের ভাবনাগুলো তার অমূলক নাকি সত্যিই কোনো ভিত্তি আছে! কফি সহযোগে মনোহর ঝুলি খুলে বসলেন। বেশিরভাগ কথায় এমনভাবে বলছেন যেন অলোককান্তি সন্দেহভাজন কোনো অপরাধী। বলা যেতে পারে তথ্য যাচাই পর্ব যেন। ভদ্রলোকের ভাবখানা এমন যে অলোককান্তি যেন নিজের তাগিদে এদেশে এসে হাজির হয়েছে। তার কথা থেকে বোঝার উপায় নেই যে অলোককান্তি তারই আহ্বানে এখানে এসেছে। তথ্য যাচাই পর্বের মাঝখানে অলোককান্তি মনোহরকে প্রশ্ন করে এই দত্তদের সাথে তার ঠিক কী সম্পর্ক। গ্র্যান্ড পা অনেক কথা তাকে বললেও কোনো বিশ্বাস পদবি ধারীর কথা বলেন নি। উত্তরে মনোহর জানায় সব জানবেন মশাই ক্রমশ প্রকাশ্য। অবশেষে অনেক ক্রশ কোয়েশ্চেনিং করে ভদ্রলোক অলোককান্তিকে তখনকার মতো রেহাই দিলেন। বলে গেলেন বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ আবার আসবেন। কোনো একটা জায়গায় নিয়ে যাবেন। ততক্ষণ অলোককান্তি নিজের মতো সময় কাটাতে পারেন। মনে পড়ল গ্র্যান্ড পা বলেছিল কৃষ্ণনগর মৃৎশিল্পের জন্য খ্যাত। এই ফাঁকে তার কিছুটা অন্তত যদি চোখে দেখা যায়। এই ভেবে বেরিয়ে পড়লেন।
।। তিন ।।
হোটেলের ম্যানেজার তাকে একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে দিয়েছে। লাঞ্চ সেরে অলোককান্তি সেই গাড়িতে শহর পরিক্রমা সারতে উপস্থিত হয়েছে ঘূর্ণিতে। মাটির পুতুল কত নিখুঁত হতে পারে সে বিষয়ে যখন সে বিস্ময়াবিষ্ট ঠিক তখনই তার ফোনটা বেজে ওঠে। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে ডাক্তার। অলোককান্তি ভাবে ওখানে তো সবে সকাল শুরু হয়েছে এসময় ডাক্তার কেন ফোন করছে! অবশ্য ফোন ধরতেই বুঝল আসল কারণটা। কী মিস্টার ডাট মনোহরের সঙ্গে দেখা হল তাহলে। অলোককান্তি বুঝল মনোহর কতটা ধুরন্ধর অথবা প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন। ডাক্তারের কাছে বাংলা ভাষার পাঠ নিয়েছে শুনে ক্রশ চেকিং করেছে। কিন্তু ডাক্তারের ওখানকার ফোন নাম্বার পেলেন কিভাবে! সেটা অবশ্য ডাক্তারই খোলসা করে দিল। কৃষ্ণনগরের চেম্বারের যে অ্যাটেন্ডেন্ট ছেলেটি ছিল তার কাছে গিয়ে ডাক্তারের ফোনে ফোন করিয়ে কথা বলেছেন। ডাক্তারের পুরনো পেসেন্ট মনোহর বিশ্বাস। ডাক্তার ওই অ্যাটেন্ডেন্ট ছেলেটির ফোন নম্বর পাঠিয়ে দিচ্ছে , দরকার হলে যোগাযোগ করা যাবে। বলে ফোন কেটে দিল। বেশ খানিকটা এলোমেলো চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এই মনোহর লোকটা আসলে কী চাইছে! যে মিষ্টির বিপদের কথা বলে তাকে এখানে আসতে বাধ্য করা হল সে বিষয়ে মনোহর একটা কথাও বলেনি। এতে আরো রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে অলোককান্তির মনে। মেজাজ কেমন খিঁচড়ে গেছে ডাট সাহেবের। কোনো কিছুই আর মন থেকে ভালো লাগছে না। খানিকটা ওপর ওপর চোখ বুলিয়ে আরো কিছুটা সময় কাটিয়ে হোটেলের ঘরে ফিরে সবে এককাপ ধূমায়িত চা নিয়ে বসেছেন এমন সময় দরজায় নক করার শব্দ। অলোককান্তি ঘড়ি দেখলেন ঠিক সাড়ে চারটে বাজে। দরজা খুলে বুঝলেন মনোহর বিশ্বাসের সময় জ্ঞান যথেষ্ট প্রখর। সকালের পোশাক বোধহয় পরিবর্তন করার সময় পাননি। তবে চেহেরাতে একটা ক্লান্তির ছাপ পড়েছে মাত্র। অলোককান্তি ভদ্রতা করে তাকে এককাপ চা অফার করলেন। চা পান করতে করতে অলোককান্তি তাকে বললেন আপনি কিন্তু এখনো আমাকে আপনার পরিচয় দেননি বা মিষ্টির কি বিপদ সেটাও বলেননি। মনোহর বিশ্বাস রহস্যময় হাসি উপহার দিয়ে বললেন সব জানবেন মশাই একটু ধৈর্য ধরুন। অলোককান্তি আর কথা বাড়ালেন না। চা পান পর্ব শেষ হতেই মনোহর তাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। মনোহর বিশ্বাস নিজের গাড়িতেই অলোককান্তিকে চাপিয়ে শহরের দক্ষিণ দিকের রাস্তা ধরে এগিয়ে চললেন। নতুন দেশে নতুন শহরে সব কিছুই অলোককান্তির কাছে একটা বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। গাড়িতে বসে মনোহর শহরের রাস্তা চেনাতে চেনাতে অল্প কিছু সময়ের মধ্যে একটা পাড়ার মধ্যে গাড়ি ঢোকালেন। এ রাস্তাটা তুলনামূলক ভাবে বেশ ন্যারো, উল্টো দিক থেকে কোনো গাড়ি এলে দুটো গাড়ির পাশাপাশি একে অপরকে রাস্তা ছাড়া বেশ কঠিন। মনোহরের সেসব হুঁশ আছে বলে মনে হচ্ছে না। খুব সাবলীলভাবে গাড়ি চালিয়ে একটা তস্য সরু গলির মুখে গাড়ি দাঁড় করালেন। গাড়ি থেকে নেমে অলোককান্তিকে আহ্বান করলেন নেমে আসার জন্য। একটু ইতস্তত করে অলোককান্তি নামলেন আর মনোহর বিশ্বাসের পিছনে পিছনে ওই সরু গলির মধ্যে ঢুকলেন। আনুমানিক পঞ্চাশ মিটার মতো হেঁটে একটা পরিত্যক্ত বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে মনোহর তাকে পথ দেখিয়ে ভিতরে নিয়ে চললেন। দরজার মুখে এক যুবক দাঁড়িয়ে যেন তাদেরই অপেক্ষা করছিল। নরম সুরে আসুন স্যার বলে তাদের আহ্বান জানালো। ভিতরে ঢোকার আগে অলোককান্তি বাড়িটার দিকে খুব ভালো করে তাকিয়ে দেখলেন। শুধু পরিত্যক্ত নয় বাড়িটা একরকম হানাবাড়ি বলেই মনে হল তার। মনে মনে ভাবলেন এই রকম একটা ভাঙাচোরা বাড়িতে তাকে কী দেখাতে নিয়ে এলেন মনোহর। এ বাড়িতে যে কেউ এখন আর বাস করে না তা বোঝা যাচ্ছে। এসে যখন পড়েছে তখন দেখতে হবে কী রহস্য লুকিয়ে আছে এই বাড়ির ভিতরে।
।। চার ।।
ভিতরে পা বাড়িয়েই প্রথম যে বিষয়টা তাকে অবাক করে তা হল কোনো মানুষের পক্ষে সোজা হয়ে এ বাড়ির কোনো ঘরে ঢোকা সম্ভব নয়। দরজার উচ্চতা এমন যে সকলকেই মাথা নিচু করে ঢুকতে হয়। আর অলোককান্তি তো ছ ফুট চার ইঞ্চি। অগত্যা মনোহরের সাবধান বাণী মেনে মাথা নিচু করে ঘরের ভিতরে পা রাখেন। মেঝেতে ধুলোর পলেস্তারা এতটাই পুরু যে জুতোর ছাপ পড়ছে। বাড়িটার বিশেষত্ব বা ত্রুটি প্রথম দর্শনে যেটা বড় বলে মনে হল প্রতিটা ঘরের দরজা কোনো না কোনো ঘরের মধ্যে দিয়ে। কেবলমাত্র বাড়িতে ঢোকার মুখে একফালি বারান্দা যেখান থেকে একবার ভিতরে ঢুকলে একটার পর একটা ঘরে যাওয়া যায়। পিছনে খানিকটা ফাঁকা জায়গা আছে এখন অবশ্য আগাছার জঙ্গলে ঘেরা। ক্রমাগত ঘর গুলো পার হয়ে সেখানে পৌঁছে যেন একটু বুক ভরে অক্সিজেন নিতে পারলেন। মুক্ত হাওয়াতে এবার অলোককান্তি বেশ বিরক্ত হয়ে একটু কর্কশ স্বরে মনোহরকে জিজ্ঞাসা করলেন আপনার অভিপ্রায় কী ? এই ভাঙাচোরা হানাবাড়ি আমাকে কেন দেখাচ্ছেন বলুন তো?
মনোহর বুঝলেন তার অতিথিটি বেশ বিরক্ত হয়েছেন। হাসি টেনে বললেন - এটা আপনার গ্র্যান্ড ফাদার অশোককৃষ্ণ দত্তের বাড়ি। বাড়ির ভিতরের কিছু আসবাবপত্র এখনো রয়েছে। কিছু হয়তো চুরি হয়েছে।
- আমাকে এসব দেখানোর বা জানানোর কারণ কিছু আছে বলে তো মনে হয় না।
- আপনার হয়তো কোনো দরকার নেই। কিন্তু আমার যে আপনাকে ভীষণ প্রয়োজন মিস্টার দত্ত।
কথাটা অলোককান্তির কানে কেমন যেন শোনালো। বিরক্তি মনে চেপে মনোহর বিশ্বাসকে অনুসরণ করে বাড়ির আনাচেকানাচে ঘুরতে ঘুরতে বেশ ক্লান্তি বোধ করেন অলোককান্তি। মনোহর তাকে অনর্গল বাড়ির কোথায় কি ছিল কেমন ভাবে এই বাড়ি নানা উৎসবে গমগম করত তার খতিয়ান দিয়ে চলেছেন। যার অধিকাংশ কথাতেই অলোককান্তি তেমন আগ্রহ বোধ করছিলেন না। হঠাৎই একটা ঘরের চাবি খুলে ভিতরে ঢুকে মনোহর কেমন চুপ করে গেলেন। অলোককান্তির মনে হল মনোহর যেন কোথায় হারিয়ে গেলেন, তাকে বেশ বিমর্ষ লাগলো। সেও খুব অল্প সময়ের জন্য। আবার যেন মনোহর নিজের দায়িত্ব সচেতন হয়ে উঠে তাকে একটা পালিশ চটে যাওয়া খাটের কাছে নিয়ে গিয়ে বলেন এটাই অশোককৃষ্ণ দত্তের শোবার খাট। আপনার গ্র্যান্ড ফাদার অনিমেষকান্তি দত্ত মশায় ও একসময় এই ঘরে থেকেছেন। মানে দুই ভাই একসাথে বেশ কিছুদিন কাটিয়েছিলেন। শেষবার যখন আসেন তখনও এই ঘরেই ছিলেন। কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল অলোককান্তির। মনে হয় যেন তার গ্র্যান্ড পা আশেপাশেই রয়েছে আর সেই ছোটো বেলার মতো একমুখ হাসি নিয়ে তাকে বলছেন কি রে বলেছিলাম না যে সবাইকেই কোনো না কোনোদিন শিকড়ের সন্ধানে যেতে হয়। তোকেও অবশেষে এসে দাঁড়াতে হল আমার ফেলে আসা শৈশবের বেদি ভবনে। ঘরের মধ্যে এখানে ওখানে ছড়িয়ে রয়েছে বেশ কিছু হাতে আঁকা ছবি। ধীর পায়ে অলোককান্তি গিয়ে দাঁড়ালেন একটা ছবিটার সামনে। যদিও ঝুল ধুলো ময়লায় ছবির মানুষটিকে ঠিক ঠাক বোঝা প্রায় সাধ্যাতীত। তবুও বোঝা যায় ছবির মানুষটি যথেষ্ট সুপুরুষ ছিলেন। বাইরে আলো কমে আসছে আর এ বাড়ির ঘরে তো আলোর প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত। তাও অলোককান্তি বেশ একটু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ছবির মানুষটিকে দেখতে চেষ্টা করলেন। মনে হল মানুষটি যেন তার খুব চেনা। ঠিক সেই সময় মনোহর বিশ্বাস বললেন ইনি কৃষ্ণকান্তি দত্ত, আপনার ঠাকুরদার ঠাকুরদা। এতক্ষণে অলোককান্তি বুঝতে পারলেন কেন তার চেনা মনে হচ্ছিল। গ্র্যান্ড পা অনিমেষকান্তি দত্তের সঙ্গে আশ্চর্য রকম মিল ছবির কৃষ্ণকান্তি দত্তের। সন্ধ্যার অন্ধকার নামতে নামতে মনোহর অলোককান্তিকে তার হোটেলের সামনে নামিয়ে দিয়ে বিদায় নিলেন। বলে গেলেন বাকি কথা কাল এসে বলবেন।
।। পাঁচ ।।
সারাদিনের ক্লান্তিতে অলোককান্তির শরীর আর টানছিল না। সোফায় গা এলিয়ে বসে চোখ বন্ধ করতেই স্বপ্নের মতো পোড়ো বাড়িটা মনে ভেসে উঠল। প্রথমেই যে বিষয়টা অলোককান্তির মনে হল এই রকম একটা পরিবেশ থেকে তার গ্র্যান্ড ফাদার যেখানে পৌঁছেছিলেন সে জার্নিটা খুব সহজ ছিল না। আজকের দিনে হয়তো এতটা অবাক হওয়ার মতো কিছু নয় কিন্তু সেসময় অনেক প্রতিবন্ধকতা জয় করতে হয়েছে। আলস্য কাটিয়ে অলোককান্তি এক কাপ কফি সহ বসে পড়লেন পুরনো একখানি ডায়েরি নিয়ে। ডায়েরিটা ওই ঘরেই রাখা ছিল। মনোহর বিশ্বাস আজ রাতে তাকে পড়ে দেখতে বলেছেন। পাতা ওল্টাতে প্রথমেই অলোককান্তি অবাক হলেন মেয়েলি হস্তাক্ষর দেখে। ডায়েরিটা কোনো এক মিতালী বিশ্বাসের জবানিতে লেখা। হঠাৎ মনে এল তাহলে কি মনোহর বিশ্বাস এই মিতালী বিশ্বাসের কোনো আত্মীয়! সমস্ত পাতা জুড়ে কর্তা মশায় অশোককৃষ্ণ দত্তের নানা কীর্তি অনেকটা কাহিনী আকারে লেখা হয়েছে। যেটুকু অলোককান্তি অনুধাবন করতে পারলেন যে এই মিতালী বিশ্বাসের তত্ত্বাবধানে অশোককৃষ্ণ শেষ বয়স অতিবাহিত করেছেন। অশোককৃষ্ণ মধ্য বয়সে বিপত্নীক হয়ে দুই ছেলেকে নিয়ে আতান্তরে পড়েছিলেন এবং অকাল বিধবা মিতালীর সাহায্যে তার ছেলেদের বড় করেছেন। নিঃসন্তান মিতালী একরকম সন্তান স্নেহে তাদের দেখাশোনা করেছেন। তাদের সাথে মিতালী দেবীর বয়সের তফাৎ কম থাকায় তারা প্রায় বন্ধুর মতো ছিল। গোল বাধে অশোককৃষ্ণ বয়সকালে তার দুই ছেলের কাউকেই বিয়ে দিতে পারেন নি। দুই ভাই কেউ সংসার জীবন বেছে নিতে রাজি হয়নি। মিতালীর অনেক আগেই তারা এ পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নেয়। মিতালী দেবী যতদিন বেঁচে ছিলেন তিনি আগলে রেখেছিলেন কৃষ্ণকান্তির এ সম্পত্তি। এই ডায়েরির শেষে মিতালী দেবী দত্ত পরিবারের যে বংশলতিকা লিপিবদ্ধ করে গেছেন তাতেই এক শাখায় বিরাজ করছেন অনিমেষকান্তি, অমলকান্তি আর আশ্চর্য হলেও অলোককান্তি। বুঝতে বাকি রইল না যে তার গ্র্যান্ড পা শেষ বার যখন এদেশে এসেছিলেন তখনই এসব তথ্য মিতালী দেবী সম্ভবত সংগ্রহ করে থাকবেন। আগাগোড়া পড়ার পর অলোককান্তির মনে মনোহরকে নিয়ে রহস্য কাটল না। মিতালী দেবীর সঙ্গে পদবির একটা মিল রয়েছে ঠিকই কিন্তু ডায়েরিতে মনোহরের কোনো উল্লেখ নেই। ডায়েরির শেষে বেশ কিছু পাতা ফাঁকা, আনমনে পাতা গুলো ওল্টাতে গিয়ে পেলেন একটা চিঠি। এটি সম্বোধন করা হয়েছে কোনো এক মিষ্টি মাকে আর চিঠির শেষে নাম দেখে চমকে উঠলেন অলোককান্তি। জ্বলজ্বল করছে মনোহরের নাম। যদিও মিতালী দেবীর সঙ্গে এ পরিবারের কোনো সম্পর্ক নেই কিন্তু এই চিঠিটা অলোককান্তিকে বেশ সংশয়ে ফেলে। মিতালী দেবীর বয়ান অনুসারে অশোককৃষ্ণ দত্তের এই সম্পত্তির কোনো দাবিদার নেই। তাহলে কি মনোহর কোনো ভাবে নিজের অধিকার কায়েম করতে এই চিঠিটা ডায়েরির ভেতরে রেখেছেন। কিন্তু চিঠিতে মিতালী দেবীকে মিষ্টি মা বলে উল্লেখ করা ছাড়া আর কোনো সূত্র পাওয়া গেল না। ভাবতে ভাবতে একটা কথা অলোককান্তিকে বিস্মিত করে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কেউ ছাড়া তো এতসব কিছু জানা অসম্ভব। তবে কি মনোহর বিশ্বাস কোনো ভাবে এ পরিবারের সাথে সম্পর্কিত যা হয়তো মিতালী দেবীর লেখাতে অনুক্ত থেকে গেছে! এসব সাত পাঁচ ভাবনা নিয়ে রাতে ঘুমিয়ে পড়েন অলোককান্তি।
।। ছয় ।।
পরদিন সকাল থেকে অলোককান্তি রহস্য ভেদ করতে পথে নামলেন। একবার ভেবেছিলেন এই পোড়ো বাড়ির প্রতি তার কোনো ইন্টারেস্ট নেই তাহলে শুধু শুধু দৌড় ঝাঁপ করে সুস্থ শরীর ব্যস্ত করে কী লাভ! কিন্তু ততক্ষণে অলোককান্তি রহস্যের জালে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছেন। সে জাল না কেটে অচেনা অজানা মনোহরের উপর অন্ধ বিশ্বাস নিয়ে হাল ছেড়ে দিতে পারেন না। প্রথমেই অলোককান্তি সকাল সকাল গিয়ে দাঁড়ালেন বাড়িটার সামনে। বাইরে থেকে খুব ভালো করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকলেন। চারদিকের পাঁচিল বলে এখন আর কিছু নেই তাই বাড়িটার কাছে যেতে কোনো বাধাও নেই। শুধু পিছন দিকে জঙ্গলে ঢাকা বলে তেমন কিছু চোখে পড়ল না। বেরিয়ে আসার সময় হঠাৎই চোখে পড়ে সামনের বারান্দার দেয়াল ঘেঁষে উত্তর মুখো দেয়ালে একটা পুরনো পাথরের ফলকে লেখা কৃষ্টি কুটির। আবার পিছন ফিরে খানিকটা গিয়ে পাঁচিলের অবস্থান সন্ধান করলেন। একসময় এদিকটাই ছিল সদর তাই বাড়ির নাম ফলকটি এদিকে মুখ করে লাগানো ছিল।এখন যেদিক দিয়ে প্রবেশ পথ যে বারান্দা ঘেরা জায়গা সেটা পরে নির্মাণ করা হয়েছে আর সেই বারান্দার সামনে লাগানো হয়েছে নতুন ফলক মিষ্টি মহল। ফিরে আসার জন্য রাস্তায় পা রাখতেই উল্টো দিকের বাড়ি থেকে এক বৃদ্ধের গলা শুনে থমকে দাঁড়ালেন অলোককান্তি।
সাহেব কি এই বাড়িটা কিনবেন ভাবছেন?
হাতে যেন স্বর্গ পেলেন অলোককান্তি। সম্মতি সূচক মাথা নেড়ে এগিয়ে গেলেন বৃদ্ধের দিকে।
এটাই বুঝি আপনার বাড়ি? আপনি কি বরাবর এখানেই থাকেন?
সে আবার কি কথা! এটা তো আমার বাপের ভিটে। এখানেই জন্মেছি আর এখানেই মরব। কিন্তু আপনাকে দেখে তো মনে হচ্ছে আপনি এদেশের মানুষ নন।
আপনি ঠিকই ধরেছেন। আমি বহুদিন দেশ ছাড়া।
- তো এ বাড়ির সন্ধান কে দিল আপনাকে?
এরকম নানা কথা বলে বেশ কিছু তথ্য সংগ্রহ করে ফিরে এলেন হোটেলের ঘরে। দুপুরে আবার হোটেল থেকে বেরিয়ে গেলেন পৌরসভা অফিসে। সেখানে একটু বেগ পেতে হল খাতা পত্র খুঁজে তার প্রয়োজনীয় সূত্র বের করতে। অবশ্য তার কারণও আছে বাড়ির কোনো ভ্যালুয়েশন হয়নি ট্যাক্স জমা পড়েনি বহু বছর। একালে সব কম্পিউটারাইজড হয়ে গেছে ফলে খাতাপত্রের ব্যবহার নেই বললেই চলে। যে বাড়ির কোনো ট্যাক্স জমা পড়েনি তার তথ্য কম্পিউটারে তোলাই হয়নি। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অলোককান্তি সেসব তথ্য জোগাড় করতে সক্ষম হলেন। তার সাহেবিয়ানা এবং ইংরেজি ভাষায় কথা বলা অনেকটা কাজ দিয়েছে সন্দেহ নেই। ব্রিটিশরা দেশ ছেড়ে গেলেও তাদের প্রতি দেশের সাধারণ মানুষের জড়োসড় ভাব আজও বিদ্যমান। সেটাই কাজে লাগালেন অলোককান্তি।
সন্ধেবেলা হোটেলের ঘরে মনোহর বিশ্বাসের মুখোমুখি হয়ে অলোককান্তি বেশ তরল স্বরে আলাপ শুরু করলেন।
- তা মিস্টার বিশ্বাস একটু ড্রিংকস চলবে নাকি?
হাসি মুখে সম্মতি জানালেন মনোহর। দুজনে দূটো সুদৃশ্য গ্লাস নিয়ে চিয়ার্স করে কথা শুরু করলেন।
- মিস্টার দত্ত ডায়েরিটা নিশ্চয়ই আপনি পড়েছেন। আর এখন এটাও নিশ্চিত বুঝতে পেরেছেন যে কেন আপনাকে এখানে আসতে বলেছি।
- ডায়েরিটা পড়েছি ঠিকই কিন্তু তার সাথে আমার এখানে আসার কারণটা আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। ওই বাড়ি বা সম্পত্তি নিয়ে আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই সে তো আপনি বুঝতে পারছেন। কিন্তু মিস্টার বিশ্বাস আপনি কিছু মনে করবেন না এখনো পর্যন্ত আপনি কিন্তু নিজের পরিচয় গোপন রেখেছেন আমার কাছে। এবার অন্ততঃ সেটা খোলসা করুন।
একথার কোনো উত্তর না দিয়ে বার দুই অলোককান্তিকে জিজ্ঞাসা করলেন ডায়েরিটা ভালো করে পড়েছে কিনা? অলোককান্তি বুঝলেন মনোহর চিঠিটার কথা জানতে চাইছেন। ডায়েরিটা বের করে মনোহরের সামনে রাখলেন। মনোহর খানিকটা অবাক হয়ে অলোককান্তির দিকে তাকিয়ে ডায়েরিটা উল্টে পাল্টে দেখলেন। অবশেষে হতাশ হয়ে গ্লাসে সিপ্ করে কিছু বলতে গিয়ে গিলে ফেললেন।
- কী হল মিস্টার বিশ্বাস? নিজের পরিচয় দিতে আপনার এত দ্বিধা কেন বলুন তো! আপনার তো একটা গর্ব করার মতো পরিচয় রয়েছে।
এবার মনোহর মাথা নিচু করে বসে থাকেন। অলোককান্তি নিশ্চিত হয়ে গেলেন চিঠিটা পরবর্তীতে মনোহর বিশ্বাসই ডায়েরিতে রেখেছেন। অবশেষে অলোককান্তি শুরু করলেন।
- মিস্টার বিশ্বাস আপনি সুবিনয় বিশ্বাসকে নিশ্চয়ই জানেন। আপনার ঠাকুরদার বাবা তাইতো?
কোনো কথা জোগালো না মনোহরের মুখে। অধমস্তকে বসে রইলেন। অলোককান্তি বলে চলেন। মিস্টার বিশ্বাস আপনার ঠাকুরদার বাবা আর আপনার ঠাকুরদা দুজনেই অত বড়ো মাপের শিল্পী দেশ ব্যাপী তাদের খ্যাতি। তাদের সাধের কৃষ্টি কুটির আপনি মিষ্টি মহল বানিয়ে ফেললেন। কার্জনের নির্দেশ প্রচারিত হতে কৃষ্ণকান্তি দত্ত পরিবার নিয়ে চলে আসেন কৃষ্ণনগর। বিশ্বাস পরিবার তখন কলকাতাতে স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেছেন। তখনই এক পরিচিত বন্ধুর কাছে খবর পেয়ে কৃষ্ণকান্তি বাড়িটা কিনে নেন। দত্ত পরিবার কিন্তু বাড়ির নাম বদল করে নি। সেই কৃষ্টি কুটির আপনার লোভের কারণে মিষ্টি মহল হয়ে যাবে আপনি ভাবলেন কীভাবে? আপনি তো আইনের ছাত্র কিন্তু পশার হয়নি সেভাবে তাই ভাগ্যান্বেষণে বাপ ঠাকুরদার ফেলে যাওয়া শহরে এসে জাঁকিয়ে বসলেন। আইনের মানুষ বলেই লোভটাকেও আইনসিদ্ধ করতে ডেকে আনলেন আমাকে। কি ঠিক বলছি তো?
এতক্ষণ চুপ করে শুনছিলেন মনোহর বিশ্বাস। এবার বললেন প্রতারণা করে আমার নামে করে নিতেই পারতাম তাই না? তা কিন্তু করি নি। আমি বাপ ঠাকুরদার ভিটে ফিরে পেতে চেয়েছিলাম বিশ্বাস করুন মিস্টার দত্ত।
সব ঠিক আছে কিন্তু আপনি অত্যন্ত কৌশলে একজন মহিলার চরিত্র হনন করতে উদ্যত হয়েছিলেন। আপনি জেনেছিলেন আমার ঠাকুরদারা দুই ভাই মিতালী দেবীকে কতটা স্নেহ করতেন ভালোবাসতেন। তাদের ভরসার সেই মিষ্টি কে নিয়ে আপনি নোংরা খেলা খেলতে চাইলেন। আপনি একটা ভুল করে বসেন ওই কৃষ্ণকান্তি দত্তের অয়েল পেন্টিংটা আমাকে দেখিয়ে। ছবিটা এঁকেছিলেন আপনার ঠাকুরদা সুপ্রতীক বিশ্বাস। ছবিটার কোণে নামটা লেখা আছে। আপনি হয়তো কখনো খেয়াল করে দেখেননি। এটাই আমার বড় সূত্র, ইন্টারনেট পরের বিষয় গুলো জানিয়ে দিল। আর আপনার লাগানো মিষ্টি মহল ফলকটি যে নতুন লাগানো হয়েছে এটুকু বুঝতে খুব বেশি বুদ্ধির দরকার হয় না মিস্টার বিশ্বাস।
- আপনি তো আর এ দেশে থাকবেন না। কী হবে এই সম্পত্তির! গভর্নমেন্ট ভ্যালুয়েশন অনুসারে দাম দিতে আমি রাজি মিস্টার দত্ত। আমার পরিবারের স্মৃতি দয়া করে আমাকে ফিরিয়ে দিন প্লিজ।
- সে সুযোগ আর নেই মিস্টার বিশ্বাস। পৌরসভার হাতে তুলে দেওয়ার জন্য আমি ইতিমধ্যেই চুক্তি স্বাক্ষর করে এসেছি। তবে আপনার ঠাকুরদার যে সমস্ত ছবি আপনি ওই ঘরে লুকিয়ে রেখেছেন সেগুলোসহ কৃষ্ণকান্তি দত্তের অয়েল পেন্টিংটা নিয়ে ওখানে একটি সংগ্রহশালা হবে পৌরসভার তত্ত্বাবধানে। নামটি কিন্তু অপরিবর্তিত থাকবে কৃষ্টি কুটির।

পরিচিতি: ষাটোর্ধ্ব এক সংস্কৃতি কর্মী। অবসর যাপনের সঙ্গী হিজিবিজি লেখালেখি। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত হয়েছে। ভালোবাসেন কবিতা আবৃত্তি করতে ও শুনতে। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ। পেশায় ছিলেন বিদ্যালয় গ্রন্থাগারিক।