গল্প

খোঁয়াড়



প্রদীপ রায়


বিডিও অফিসে আজ বট্টু মিঞার ঘাটের ডাকের পর পশুদের খোঁয়াড়ের ডাক শুরু হয়...

চার হাজার পাঁচশো... চার হাজার আটশো...

পাঁচ হাজার... পাঁচ হাজার এক! পাঁচ হাজার দুই! পাঁচ হাজার তিন!...

ডাকবাবু পবন ডাকুয়া — ডাক হাকা বন্ধ করে বা হাত তুলে পানবর দেওয়ানির দিকে নির্দেশ করে —

নিমেষে ফলিমারি গ্রাম থেকে আসা জন কয়েক ব্যাপারীর মুখ দুশ্চিন্তার মেঘে ঢেকে যায়। চাউটিয়া ধনি মাথায় দু'হাত দিয়ে বিডিও অফিসের চটাওঠা ওয়াল ধরে মেঝেতে বসতে বসতে বলতে থাকে — "ইস! হইল না বাহে, না হইল আর..."

ফলিমারি গ্রামের ভাটিয়া পানবর দেওয়ানি জেদাজেদি করে ডাকে খোঁয়াড় নেয় — নগদ পাঁচ হাজার টাকায়। পাঁচটা গ্রাম নিয়ে একটাই খোঁয়াড়। পানবরের খোঁয়াড় পাওয়ার খবরে রংবর গাড়িয়াল, খাইচালু ও ভইচালু মাসরার মতো গ্রামের গোরু চড়ুয়া মানুষদের চোখে মুখেও ভয়ের আলো ছায়া খেলে যায় মধ্য আষাঢ়ের ঘনকালো মেঘের ডাকে। ফলিমারি ও ঘরঘড়িয়া গ্রাম ঘেঁষে পাঁচটি গ্রামের মাঝ বরাবর বুক চিড়ে আঁকাবাঁকা তোর্ষার দু'পাশের চরার বিশাল কুটির মালিক পানবর দেওয়ানি, খোঁয়ারের জিম্বাও তাঁর হাতে। গোটা নদীর বেওয়ারিশ চরে লোক দিয়ে খেসারি , মুসুর ডাল, কাউন ধান ছিটিয়ে চর দখল করে নানা অছিলায় গোরু খোঁয়ারে তোলার ফন্দি করে। এক একটি বড়ো গোরুর এক দিনে খোঁয়ারের রসিদ কাটে দশ টাকা, ছোটো বকনা গোরু ছয়। দিনের দিন না ছাড়ালে চার পাঁচ গুণ হারে ছাড়ানোর রসিদ কাটে ম্যানেজার পাঙালু মিয়া। ভাগা গুয়া পানের লালচে থুতুতে টাকা গুনে নেয় কড়ায়-গণ্ডায়। এক সপ্তাহে গোরু ছাড়াতে না পারলে নিলামে গোরু বিক্রি করে পাচার করে দেয়। আষাঢ় মাসের টানা বৃষ্টিতে সন্ধ্যা থেকে ভুলুয়াদের গাইগোরু, বকনা বাছুরের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না, মাঠের চারপাশে বর্ষার জল। ভুলুয়ার বাবা পঙ্কনাথ বিকেলে মাঠে জঙ্গলে খোঁজ করে বকনা ও গাইগোরুর খোঁজ না পেয়ে দাওয়ায় বসে পথের বন্ধু বিড়ির ধোঁয়া টানছে দম দিয়ে দিয়ে, কপালে ছিটকে এসে পরেছে মেঘ গর্জনের আলো। বাইরে আষাঢ়ের আমাতির অবিশ্রান্ত বৃষ্টিতে দেবতারা আনন্দে স্নান করছে। ভুলুয়ার মা দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে জলঢেপা ভাতের মার জলে লবণ ও হলুদ মিশিয়ে রাতের কৃত্রিম ডালের ব্যবস্থা করছে। বৃষ্টি-বাদায় বাড়ির বড়োরা লবণ টোকা, ছিদল প্যাল্কা, ফোকতই দিয়ে সিদাভাত খেতে পারলেও ছোটো ভুলুয়া — মায়ের কাছে ডালের বায়না তোলে, মায়ের মন তাই ছেলেকে বুঝ দেওয়ার জন্য নকল ডালের আয়োজন।

"ভুলুয়ার বাপ, কঙ খোঁয়াড়ত দিলেক বা কাও শত্রুতা করি"...

"দিবারও পায়... যা দিন কাল পইরছে! দুই টাকার লোভত পরি...!"

পঙ্কনাথ আশঙ্কাভরা মুখ করে বিড়ির ধোয়া নাক দিয়ে ছেড়ে এক নিশ্বাসে বলতে থাকে কথাগুলি । পাশে খড়ের ঘরে বাঁশের চাঙরের বিছানায় শুয়ে বছর দশেকের ভুলুয়ার মাথায় বাবা মায়ের অনেক কথার ভিড়ে একটি কথা ঘুমানি পোকার মতো ঘুর পাক কাটে কেবল — "খোঁয়াড়"। ছোটোবেলা থেকে ঠাকুমার সঙ্গে নদীর চরায় গোরু মোষ চরাতে চরাতে এই শব্দটির সঙ্গে পরিচয় সে। ঠাকুমার কাছে জেনেছে মানুষের যেমন অপরাধ করলে ঠাই হয় জেলখানায়, গোরু মোষের তেমন কারো ফসল খেয়ে নষ্ট করে দিলে ঠাই হয় পানবরের খোঁয়াড়ে। খোঁয়াড় থেকে গোরুকে ছাড়িয়ে আনা মানেই দিন কয়েক উপোস। খড়ের ঘর দিয়ে সকাল থেকে বর্ষার জলে টিপ টিপ শব্দে এসবের সে কিছুই টের পায়নি। গাই বকনাকে কী তা হলে কেউ খোঁয়াড়ে দিল! আর আজ টাকার অভাবে ছাড়াতে না পারলে, রাত পোহালে সে তো কয়েকগুন! অনেক টাকা! আর এক সপ্তাহে না পারলে... নিমেষে একরাশ আতঙ্ক ও চিন্তা নেমে আসে ভুলুয়ার মনেও...

ভরা বর্ষায় নিষ্কর্মা খেত মজুরদের ভরসা যে তাঁদের গাই গোরু, ছোট্ট ভুলুয়াও বুঝতে পারে তা। রোজ আধ সের দুধে জল দিয়ে তিন পোয়া করে বাজারে বিক্রির — যে দুটো টাকা আসে তাই দিয়ে তাঁদের সংসার চলে। খোঁয়াড় থেকে ছাড়াতে হলে ষোলো টাকা! কম করে তাঁদের এক সপ্তাহের দুধের দাম। ভুলুয়া দাগটানা খাতায় একেকটা দাড়ি গুণে হিসেব বোঝার চেষ্টা করে। কিন্তু সদ্য দাগ গুণে যোগ-বিয়োগ শেখা ভুলুয়া — বাবা মায়ের অভাবের সংসার জীবনের এই অঙ্ক কিছুতেই মেলাতে পারে না!

চাউটিয়া বর্মনের খোঁয়ারের জিম্বায় অত কড়াকড়ি ছিল না, তোর্ষা, ঘড়-ঘড়িয়া, কালজানির চর এলুয়া কাশিয়া ঘাসে ভরতি ছিল, নদীর চরে বাথান তুলে বিভিন্ন অঞ্চলের মইষাল বন্ধুরা চরাতো গোরু মোষ, মনের সুখে বাউদিয়ারা প্রাণ খুলে ভাওয়াইয়া গান, দোতরায় তারে ডাং দিত। বাথানে বসতো দোতারা ভাওয়াইয়ার আসর। খোলা নদীর চরে একমাস ধরে বসতো — জারি গান,পালা গান ও কুশান পালা। যাত্রার দলে পাড়ার কতক ছেলে-ছোকরারা ছুকরির, দোয়ারির সুযোগ পেত। দোতারা বাজানো বাউদিয়াদের কপালে জুটত দু-চারটে খুচরো অভিনয়। ভুলুয়া ঠাকুমার সঙ্গে কত যাত্রা-কুশান পালা রাত জেগে দেখত নদীর চরে। পাড়ার দোয়ারি নুকু বর্মনের হাস্যকর কথায় কুশান পালার দর্শক এক সঙ্গে হাস্যবোল ধরলে ফাঁকা তোর্ষার চর শীতের রাতেও কেঁপে উঠত। কুশান পালার ছুকরি নুকু দোয়ারিকে নিন্দা-মন্দ করলে শ্লোক বেঁধে জবাব দিত — "এচায় নেন্দে পেঁচাক, স্বর্গে নেন্দে তারাক, নিজে হলু তুই ভাকুড়া গালি, মোক কইস ট্যারা...!

নুকু দোয়ারির মোক্ষম জবাবে ছুকরির জব্দ হওয়াতে পালার আসরে ভুলুয়াও ঠাকুমার কোলে বসে খিলখিল করে হেসে ওঠে। ঠাকুমা আজ বেঁচে নেই ভুলুয়ার, কিন্তুক কথাগুলি মনে পড়ে খুব তার। ময়নার চখুর জল, রাজা হরিশ্চন্দ্র, আদালতে অগ্নিকন্যা — এরকম কত ইচিকবিচিক যাত্রাপালার পাঠ মুখস্ত করত ভুলুয়া। পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে নকল যাত্রা ও কুশান পালার দল বাঁধত, যাত্রাপালা-কুশান পালা খেলত। রাতভর জেগে ঠাকুমার কিচ্ছার হুকারি দিত, ছিল কিচ্ছা শুনুয়া দলের সর্দার — ঝক্কিও পোহাতে হতো, রাতে ঠাকুমার জন্য বিড়ির জোগান তার দায়িত্বে। আগে নদীর চরে গোরু চরাতে গিয়ে কারো ফসলে মুখ দিলে মাসোহারাকে দু'একটা গালমন্দ করত, সবক শেখানোর জন্য গোরু মোষ নিজের উঠোনে বেঁধে রাখত, কিন্তু সহজে খোঁয়ারে দেবার কথা কেউ মাথায় আনত না। কিন্তু সময়ের স্রোতে দেখ কেমন দিন পালটায় — মানুষ মানুষে সহ্য করার শক্তি কেমন করে কমতে থাকে। নিজের ভিটেমাটি হাড়া ভুলুয়ার ঠাঁই হয় ক্রমে গ্রামের জমিদারের বাঁধা মাসোহারায়।

অনেক দিন পর ভুলুয়া আজ সন্ধ্যায় নদীর বাঁধে বসে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। বর্ষার ভরা তোর্ষার ঘোলা জল বাঁধের গায়ে কেমন মোচর দিয়ে পাক খায়, ভুলুয়া বাউদিয়ার ভিতরটাও অতীত-বর্তমানের ধোঁয়াটে স্মৃতিতে মোচড় দিয়ে ওঠে আজ। মনে পরে ভাওয়াইয়া গানের কথা, বাথান-মইষাল বন্ধুর দোতোরার স্মৃতি উছলে ওঠে নদীর জলে। ঠাকুমার কথা মনে পরে — 'গরুর জেলখানা হইল খোঁয়াড়।' দুপুরে প্যাল্কার ঢেঁকুর ওঠে ঘন ঘন। বুকশুলা লাগা তোর্ষায় এখন বোরোলি মাছের বহর কম। চরের গোরু চড়ুয়া ভাইদের আধভাঙা সুরের ভাওয়াইয়া এখন উধাও। চারদিকে শুধু মানুষের জেল আর গোরুর খোঁয়াড়। ভুলুয়া মনে মনে ভাবে — 'চারদিকের মানুষ কী তবে এলা গোরু-মোষ হয়্যা গেইল'! কথায় কথায় জেল আর খোঁয়াড়। হাড়াজোড়া দেওয়া গাছের ডাল মুখে নিয়ে বাউদিয়া অনমনে চিবোতে থাকে, বুনুয়া লজ্জাবতী গাছের পাতায় হাত বুলিয়ে দেখে পাতাগুলি ক্যামন করে মিইয়ে যায়। বাউদিয়ার স্মৃতিতে ভেসে আসে রামভোলা জমিদারের বাঁধা মাসোহারা খাটার দিনগুলি, ভাবে ছোটো ভুলুয়াও ধীরে ধীরে কেমন করি বাউদিয়া হইয়্যা গেইল! মোষের গাড়ি নিয়ে কত হপ্তার হাটে হাটে সে ঘুরত... ডোডেয়ার হাট, মাদাইকালী হাট, গোসানিমারির হাট! কত মানুষ, কত স্মৃতি! সে সব এখন অতীত চুরানব্বই বছর বয়সি বাউদিয়া ভুলুয়ার জীবনে...

পরিচিতি: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের গবেষক। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় গল্প এবং গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। কোচবিহার, পশ্চিমবঙ্গ।